Home খবর তুমি কে — সেটা এখন ঠিক করবে রাষ্ট্র

তুমি কে — সেটা এখন ঠিক করবে রাষ্ট্র

0 comments 4 views
A+A-
Reset

২০২৬-এর মার্চে  ভারতে পাস হওয়া তিনটি বিল একসঙ্গে পড়লে একটি ছবি স্পষ্ট হয়: ধর্ম, লিঙ্গ পরিচয় আর ভালোবাসা — এই তিনটি সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়কে এখন রাষ্ট্রের অনুমোদনের মুখাপেক্ষী করে তোলা হচ্ছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ধরুন, আপনি প্রাপ্তবয়স্ক। আপনি ভালোবেসে বিয়ে করতে চান এমন কাউকে, যে অন্য ধর্মের। বা ধরুন, আপনি বহুদিন ধরে অনুভব করছেন যে আপনার শরীর আর মনের মধ্যে একটা ফাঁক আছে — আপনি সেই পরিচয় বদলাতে চান যেটা জন্মের সময় আপনাকে দেওয়া হয়েছিল। অথবা ধরুন, আপনি অন্য ধর্মে আকৃষ্ট হয়েছেন এবং সেটা গ্রহণ করতে চান।

এই সিদ্ধান্তগুলো কি আপনার নিজের? ভারতের তিনটি রাজ্যে মার্চ ২০২৬-এ পাস হওয়া তিনটি বিল বলছে — না, পুরোপুরি নয়। এই সিদ্ধান্তে এখন থেকে রাষ্ট্রের ভূমিকা আছে। পরিবারের ভূমিকা আছে। ডাক্তার আর ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা আছে।

তিনটি বিল, তিনটি রাজ্য, একই মাস। মহারাষ্ট্রে পাস হলো ধর্মান্তর-বিরোধী বিল। গুজরাটে পাস হলো অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি। আর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাস হলো ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা সংশোধনী। নাম দেখলে মনে হয় এগুলো সুরক্ষামূলক। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

“তিনটি বিল আলাদা আলাদা দেখতে হলেও এগুলো একই সুতোয় গাঁথা — ব্যক্তির নিজের পরিচয় নির্ধারণের অধিকারকে রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া।”

বিল ১ · মহারাষ্ট্র

মহারাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাধীনতা বিল, ২০২৬

এই বিলটি আন্তঃধর্মীয় বিবাহের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অনুমতিকে বাধ্যতামূলক করে তুলেছে। অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করতে চান, তাকে পরিবারের সম্মতি নিতে হবে — না হলে বিষয়টিকে “জোরপূর্বক ধর্মান্তর” হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে।

⚠ আত্মীয়স্বজন বা পুলিশ — যে কেউ মামলা করতে পারবেন, এমনকি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই।

আরও উদ্বেগজনক হলো, “শিক্ষার মাধ্যমে ব্রেইনওয়াশিং”-কেও ধর্মান্তরের হাতিয়ার হিসেবে আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর মানে, কোনো স্কুল, কলেজ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান — যারা ভিন্ন ধর্মের শিক্ষা দেয় — তারাও এই আইনের আওতায় পড়তে পারে।

⚠ মব ভায়োলেন্সকে আইনি বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এই ধরনের বিলে — অন্য রাজ্যে এর নজির ইতিমধ্যে আছে।

বিবাহ এখন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার

গুজরাটের দুটি পদক্ষেপ একসাথে বুঝতে হবে। একদিকে পাস হয়েছে ইউসিসি বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, অন্যদিকে বিবাহ নিবন্ধন আইনে আনা হয়েছে কঠোর সংশোধন।

ইউসিসি-র ধারণাটি নতুন নয়। এটি সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতিতেও আছে। কিন্তু যেভাবে এই বিলটি প্রণীত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গুজরাটের সংখ্যালঘু সমন্বয় কমিটি বলছে, এই বিল মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার ও দত্তকগ্রহণের প্রচলিত রীতিনীতিকে বদলে দেবে, এবং ধর্মীয় পরিচয়কে আইনের চোখে অদৃশ্য করে দেবে।

বিল ২ · গুজরাট

গুজরাট ইউসিসি বিল ২০২৬ ও বিবাহ নিবন্ধন সংশোধনী

বিবাহ নিবন্ধনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, দম্পতিকে আবেদনের সময় তাদের বাবা-মায়ের পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে এবং লিখিতভাবে ঘোষণা করতে হবে যে পরিবার বিষয়টি জানে।

📋 আবেদন গৃহীত হলে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারিভাবে বাবা-মাকে নোটিশ পাঠানো হবে।

⏳ নিবন্ধন হবে অন্তত ৩০ দিন পরে — রেজিস্ট্রার সন্তুষ্ট হলে।

অর্থাৎ, দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিয়ে করার সিদ্ধান্তে পরিবারকে আইনিভাবে জানানো বাধ্যতামূলক — এবং সেই নোটিশ পাওয়ার পর তারা আপত্তি জানাতে পারবেন। ভারতের অনেক পরিবারের বাস্তবতায় এর অর্থ কী, তা বুঝতে কঠিন নয়।

এখানে একটু থামা দরকার। কেউ কেউ বলতে পারেন — বাবা-মাকে জানানো কি খারাপ কিছু? বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা কি ঠিক নয়? ধর্মান্তরে প্রতারণা বন্ধ করা কি প্রয়োজন নয়?

এই প্রশ্নগুলো যুক্তিসংগত। কিন্তু আইনের ভাষায় কীভাবে এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটাই মূল সমস্যা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বিবাহের আগে পরিবারের “ছাড়পত্র” নিতে বলা আর তার অধিকারকে সম্মান করা — এই দুটো বিষয় এক নয়। আইন যখন পরিবারের আপত্তিকে রাষ্ট্রীয় বাধার হাতিয়ার বানায়, তখন সুরক্ষার নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

শরীরের ওপর রাষ্ট্রের দাবি

তৃতীয় বিলটি হয়তো সবচেয়ে কম আলোচিত, কিন্তু সম্ভবত সবচেয়ে গভীর প্রভাব রাখার মতো। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি সুরক্ষা সংশোধনী বিল, ২০২৬ আসলে ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের আইনি স্বীকৃতিকে সংকুচিত করেছে।

বিল ৩ · কেন্দ্রীয়

ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি সুরক্ষা সংশোধনী বিল, ২০২৬

এই সংশোধনীতে ট্রান্সমেন, ট্রান্সউইমেন এবং জেন্ডার-কুয়ার ব্যক্তিদের — যারা আগের আইনে স্বীকৃত ছিলেন — আইনি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

🏥 লিঙ্গ পরিচয়ের সরকারি সনদ পেতে মেডিকেল বোর্ডের অনুমোদন লাগবে।

📝 লিঙ্গ পরিবর্তনের অস্ত্রোপচার হলে হাসপাতালকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, যারা কাউকে তার লিঙ্গ পরিচয় গ্রহণে “প্রভাবিত” করেছেন বলে মনে করা হবে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এর মানে, কোনো বন্ধু, পরামর্শদাতা বা সহায়তাকারী সংগঠন — যারা একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে সাহায্য করেছেন — তারাও বিপদে পড়তে পারেন।

“নিজের লিঙ্গ পরিচয় জানতে ডাক্তারের অনুমতি লাগবে — এই যুক্তিটা অনেকটা এমন, যেন কাউকে বলা হচ্ছে: তুমি যে ব্যথা অনুভব করছ, সেটা ব্যথা কিনা তা আগে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।”

তিনটি বিল, একটি প্রকল্প

এই তিনটি বিলকে আলাদাভাবে দেখলে হয়তো মনে হবে এগুলো ভিন্ন বিষয়ে। কিন্তু একসাথে দেখলে একটা সাধারণ কাঠামো স্পষ্ট হয়।

প্রথমত, তিনটিতেই ব্যক্তির নিজের পরিচয় প্রমাণ করার দায় ব্যক্তির উপরেই চাপানো হয়েছে। কোনো মানুষের বিশ্বাস, লিঙ্গ পরিচয়, বা প্রেম — এগুলো এখন বাইরের কাউকে বোঝাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তিনটিতেই “পরিবার”-কে রাষ্ট্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাবা-মায়ের অনুমতি, পরিবারকে নোটিশ — এগুলো পারিবারিক নিয়ন্ত্রণকে আইনি বৈধতা দেয়। ভারতের অনেক পরিবারে জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে নিজের সন্তানকে প্রত্যাখ্যান করার নজির আছে — আইন সেই প্রত্যাখ্যানকে এখন রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার অংশ করে তুলছে।

তৃতীয়ত, এই বিলগুলো তৃতীয় পক্ষকে — আত্মীয়, প্রতিবেশী, পুলিশ — অনুমোদন দিচ্ছে অন্যের জীবনে হস্তক্ষেপ করতে। অন্য রাজ্যে যেখানে এই ধরনের আইন আগে এসেছে, সেখানে গণপিটুনি, বাড়ি ভাঙার মতো ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটেছে।

সংরক্ষণ নয়, নিয়ন্ত্রণ

বিলগুলোর প্রবক্তারা বলছেন, এগুলো নারী ও সমাজের দুর্বল অংশকে “সুরক্ষা” দেবে। কিন্তু যাদের সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে — ট্রান্সজেন্ডার মানুষ, ভিন্নধর্মে বিবাহ করতে চাওয়া নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় — তারাই কার্যত এই বিলগুলোর কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

একটি আইন তখনই সুরক্ষামূলক, যখন সে মানুষের হাতকে শক্তিশালী করে। যে আইন মানুষের নিজের সিদ্ধান্তকে অন্যের অনুমোদনের মুখাপেক্ষী করে, সে আইন সুরক্ষার পোশাকে নিয়ন্ত্রণ।

মার্চ ২০২৬-এ তিনটি বিল পাস হয়েছে। ভারতের আরও রাজ্যে একই ধাঁচের আইন আসার সম্ভাবনা আছে। প্রশ্নটা শুধু আইনের নয়, প্রশ্নটা হলো: রাষ্ট্র কতটা গভীরে প্রবেশ করতে পারে — শোবার ঘরে, হৃদয়ে, শরীরে?

সেই প্রশ্নের উত্তর এই তিনটি বিল দিচ্ছে। এবং উত্তরটা উদ্বেগজনক।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles