Home খবর হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের পাল্টা চাল

হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের পাল্টা চাল

0 comments 5 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দেশটিকে “নরকের আগুনে” নিক্ষেপ করবেন। মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ওয়াশিংটন সময় রাত ৮টার যে সময়সীমা তিনি ইরানের জন্য বেঁধে দিয়েছিলেন, তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই স্পষ্ট হয়ে গেল—মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ‘ঈশ্বরীয় শাস্তি’র হুমকি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নেতাদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি।

গত কয়েক দিনে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সামরিক চাপ, ব্যক্তিগত অপমান এবং অশালীন মন্তব্যের মাধ্যমে ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে বাধ্য করার সবরকম চেষ্টা চালানো হয়েছে। যে প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই রণংদেহী মূর্তির বিপরীতে তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম উদাসীনতা ও অবজ্ঞা। বরং তারা নিজেদের বিশ্বের সামনে “প্রতিরোধের প্রতীক” হিসেবে তুলে ধরেছে—একটি রাষ্ট্র, যা আমেরিকা ও তার মিত্র ইজরায়েলের (যারা ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আক্রমণ শুরু করেছিল) বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে দাঁড়িয়ে।

“কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, চাই নিরাপত্তা”

কায়রোয় ইরানের কূটনৈতিক মিশনের প্রধান মোজতাবা ফেরদৌসি পুর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “আমরা কেবল একটি যুদ্ধবিরতি মেনে নেব না।” তাঁর মতে, কোনও শান্তিচুক্তি তখনই সম্ভব, যখন গ্যারান্টি দেওয়া হবে যে ভবিষ্যতে আর এই শাসনব্যবস্থার ওপর আক্রমণ হবে না। অথচ মাত্র তিন মাস আগেও এই শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে পড়ার মুখে বলে দাবি করা হচ্ছিল। ইরানের সামরিক মুখপাত্রের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি ট্রাম্পের “পুরো দেশ উড়িয়ে দেওয়ার” হুমকি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতদিন প্রয়োজন মনে করবে, ততদিন যুদ্ধ চলবে।

ইরান-বিশেষজ্ঞ গবেষক মোহাম্মদ এসলামি ও জয়নব মালাকৌতি লিখেছেন, “ট্রাম্প একটি যুদ্ধ জিততে চান, আর ইরান চায় পুরো যুদ্ধটাই জিততে।” তাঁদের মতে, তেহরানের পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালী কেবল যুদ্ধ শেষ করার অস্ত্র নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জন্য একটি স্থায়ী শক্তির উৎস।

বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘জিম্মি’ করা গোপন অস্ত্র

হরমুজ প্রণালী এখন ইরানের এমন এক গোপন অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বেশি কার্যকর। বিশ্বের মোট হাইড্রোকার্বনের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে যেত, যা এখন ১১ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিশ্ব প্রতিদিন ১১ শতাংশ তেল সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইসের মতে, “এই প্রণালী ইরানকে তাৎক্ষণিক ও অসমানুপাতিক শক্তি দেয়। পারমাণবিক অস্ত্রের মতো নয়—এটি বন্ধ করা যেমন সহজ, খোলাও তেমন সহজ। একবার এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে, ইরান কেন তা ছেড়ে দেবে?”

ইউরোপের দ্বিধা ও ট্রাম্পের ক্ষোভ

পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্প বারবার স্থলসেনা দিয়ে হস্তক্ষেপের কথা তুললেও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর তিনি ক্ষুব্ধ। তাঁর অভিযোগ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও ইউরোপ নিষ্ক্রিয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট জানিয়েছেন, শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালী “মুক্ত” করা অবাস্তব। ম্যাক্রোঁ বলেন, “অতিরিক্ত কথাবার্তা হচ্ছে। আমাদের স্থিতি ও শান্তি ফেরাতে হবে। এটি কোনও নাটক নয়।”

প্যারিস বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে মিলে একটি প্রস্তাব সংশোধনের চেষ্টা করছে, যাতে আমেরিকার নেতৃত্বে প্রণালী জোর করে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনাকে প্রতিহত করা যায়।

গেরিলা যুদ্ধের আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ শুরু হলে তা দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধে রূপ নেবে। উপকূল, মাছ ধরার নৌকা বা সাবমেরিন থেকে ইরানের ড্রোন হামলা ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হবে। এই প্রণালী পাহারায় লক্ষ লক্ষ সেনার স্থায়ী উপস্থিতি প্রয়োজন, যা বাস্তবসম্মত নয়। ইরান তাদের প্রতিটি ইঞ্চি জমি রক্ষায় হাজার হাজার সৈন্য উৎসর্গ করতেও পিছপা হবে না।

‘শত্রু’ বনাম ‘বন্ধু’: দ্বিমুখী নীতি

আগে ধারণা করা হয়েছিল প্রণালী বন্ধ করা ইরানের জন্য আত্মঘাতী হবে। কিন্তু তেহরান এক কৌশলী পথ নিয়েছে। তারা কেবল “শত্রু” দেশের জাহাজগুলোকে ড্রোন দিয়ে হয়রানি করছে, ফলে বিমা প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হওয়ায় জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, “বন্ধু” দেশগুলোর জাহাজ পর্দার আড়ালে আলোচনার মাধ্যমে পার হতে পারছে।

সপ্তাহান্তে যেখানে আগে ১৩৫টি জাহাজ যেত, সেখানে এখন ২১টি জাহাজ পার হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান (মধ্যস্থতাকারী হিসেবে), চিন, জাপান, তুরস্ক ও গ্রিসের জাহাজ সীমিতভাবে পারাপারের অনুমতি পেয়েছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগর কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা নিজেরাই প্রতিদিন ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে।

আইনি বিতর্ক ও নতুন বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ সাঈদ মাহমুদি এবং ১০০ জন মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞ এক খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন, আগ্রাসনের শিকার দেশ হিসেবে যুদ্ধের সময় এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ অবৈধ নয়। ইরান ১৯৫৮ সালের সমুদ্র আইন অনুসরণ করে, যা তাদের ‘নিরীহ চলাচল’ নিয়ন্ত্রণের কঠোর ক্ষমতা দেয়।

ইরানের সংসদে এখন একটি বিল নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকে ‘অধিকার’ নয়, বরং ‘শর্তসাপেক্ষ সুবিধা’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর জন্য ফি দাবি করা হবে। ইতিমধ্যে কিছু জাহাজের ওপর ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ফি চাপানো হয়েছে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক খেলায় ইরানের এখন চিন ও রাশিয়ার সমর্থন প্রয়োজন। যদিও চিন স্থিতিশীল জ্বালানি চায় এবং রাশিয়া অস্থিরতা এড়িয়ে তেলের উচ্চমূল্যের সুবিধা নিতে চায়, তবুও শেষ পর্যন্ত সব পক্ষ একটি আপসের দিকে যেতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত যে, ইরান হরমুজ প্রণালীকে তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা যুদ্ধের পরেও বজায় থাকবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles