Home খবর ইরান ধ্বংসের হুমকি: ট্রাম্পের ভাষা ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে তুঙ্গে বিতর্ক

ইরান ধ্বংসের হুমকি: ট্রাম্পের ভাষা ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে তুঙ্গে বিতর্ক

0 comments 6 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার, ইরানকে উদ্দেশ্য করে এমন ভাষা ব্যবহার করলেন যা কার্যত একটি সম্পূর্ণ জাতি বা সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি। তিনি তাঁর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে লিখলেন—“আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।” (A whole civilization will die tonight, never to be brought back again”)

বহুদিন ধরেই বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই ধরনের বক্তব্যকে তাঁর চেনা কৌশল—অতিরঞ্জন, ভয় দেখানো, দর-কষাকষির ভাষা—হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি যেন অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এটি শুধু কৌশলগত অতিরঞ্জন নয় বরং এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন ভাষিক বিস্ফোরণ।

হতাশা থেকে উগ্রতা

ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো—ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধে স্পষ্টতই হতাশ ও ক্রুদ্ধ হয়ে ট্রাম্প তাঁর ভাষা থেকে সমস্ত সংযম সরিয়ে ফেলেছেন। রাষ্ট্রপতির মর্যাদা বা কূটনৈতিক শালীনতার কোনো বোধ আর তাঁর বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে না।

৫ এপ্রিল তিনি সরাসরি লিখেছিলেন—”হরমুজ প্রণালী খুলে দাও, না হলে তোমাদের নরকে যেতে হবে।” একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এমন ভাষা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসে এক সাংবাদিক সরাসরি প্রশ্ন তোলেন—এই যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সে বিষয়ে তিনি কী বলবেন? ট্রাম্প প্রশ্নটি কার্যত উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, তিনি এমন কিছু শোনেননি, এবং যদি কেউ এমনটা বলে থাকে, তবে আমেরিকার আরও তাঁর মতো মানুষ দরকার কারণ তাঁর আগে দেশটি বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে ঠকছিল। এই উত্তরে প্রশ্নের মূলে থাকা উদ্বেগ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্যই থেকে যায়।

২৫তম সংশোধনীর দাবি

এই ঘটনার পরেই রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়ে ওঠে। ট্রাম্পের প্রাক্তন ঘনিষ্ঠ সহযোগী মার্জোরি টেইলর গ্রিন সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি লিখলেন—”২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করা হোক। আমেরিকার উপর একটি বোমাও পড়েনি, অথচ আমরা একটি সম্পূর্ণ সভ্যতাকে ধ্বংস করার কথা বলছি। এটা পাপ, এটা পাগলামি।”

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগভার্ন মন্তব্য করেন, মন্ত্রিসভা এমন একজন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এই সংশোধনী প্রয়োগ করবে না, যিনি স্পষ্টতই ভারসাম্যহীন। সেনেটর ক্রিস মার্ফি বলেন, তিনি যদি ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় থাকতেন, তাহলে ইস্টার ছুটির দিনটিও সাংবিধানিক আইনজীবীদের সঙ্গে কাটাতেন কীভাবে ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করা যায় তা বোঝার জন্য। তাঁর ভাষায়, এই পরিস্থিতি “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”

১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে যুক্ত হওয়া ২৫তম সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল—প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। মন্ত্রিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যদি মনে করেন প্রেসিডেন্ট তাঁর দায়িত্ব পালনে অযোগ্য, তবে তাঁরা ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেন। প্রেসিডেন্ট চাইলে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেন, তবে তখন বিষয়টি কংগ্রেসে যায় যেখানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেলে প্রেসিডেন্টকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব।

তবে বাস্তব রাজনীতিতে এই পথ প্রায় বন্ধ। কংগ্রেসে তীব্র মেরুকরণ, রিপাবলিকানদের আনুগত্য এবং ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এই সংশোধনী প্রয়োগ করা কার্যত কল্পনার মতোই কঠিন।

‘দ্য উইভ’ থেকে বিপদের ঝুঁকি

আইন বিশ্লেষক ডেভিড ফ্রেঞ্চ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, এই ধরনের ভাষা “সম্পূর্ণ উন্মাদসুলভ” এবং এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে ২৫তম সংশোধনী প্রযোজ্য হতে পারে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে মানুষ এই ধরনের আচরণে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে এর অস্বাভাবিকতা আর চোখে পড়ছে না—যা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা।

২০১৫ সাল থেকে ট্রাম্পকে কখনোই ধারাবাহিক যুক্তি বা সুসংগঠিত বক্তব্যের মানদণ্ডে বিচার করা হয়নি। তাঁর ভাষা সবসময়ই ছিল উসকানিমূলক, নাটকীয়, অতিরঞ্জিত এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভরা। তিনি নিজেই এই শৈলীকে “দ্য উইভ” নামে অভিহিত করেছেন—যেখানে বক্তব্য সরলরেখায় এগোয় না, বরং নানা প্রসঙ্গ ঘুরে আবার মূল বিষয়ে ফিরে আসে। এই শৈলী তাঁর রাজনৈতিক শক্তির অংশ কারণ এটি তাঁর সমর্থকদের কাছে স্বতঃস্ফূর্ত ও ‘অপ্রস্তুত’ মনে হয়।

কিন্তু এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনশৈলীর একটি বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। বাইডেন প্রশাসনে যেমন অভিজ্ঞ সামরিক ও অসামরিক উপদেষ্টারা ছিলেন যারা প্রয়োজনে ভিন্নমত জানাতে পারতেন, ট্রাম্পের প্রশাসনে সেই কাঠামো অনেকটাই দুর্বল। প্রতিরক্ষা দপ্তরে পিট হেগসেথ বা এফবিআইয়ের শীর্ষে কাশ প্যাটেলের মতো নিয়োগগুলো তার উদাহরণ, যেখানে অভিজ্ঞতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রশ্নটি এখন অন্য জায়গায়

মূল প্রশ্নটি এখন আর শুধু ট্রাম্প কী বলছেন তা নয় বরং তাঁকে থামানোর মতো কেউ আদৌ আছেন কি? একটি প্রশাসন যা ক্রমশ দুর্বল ও ব্যক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, সেখানে ভিন্নমত বা সমালোচনার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

এবং ঠিক এই জায়গাতেই এই সংকট সবচেয়ে গভীর কারণ যখন রাষ্ট্রপ্রধানের ভাষা ও সিদ্ধান্তে সংযম থাকে না, আর সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles