Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে; ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছিলেন যে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ না করলে ইরানের “সম্পূর্ণ সভ্যতা” ধ্বংস করা হবে।
পাকিস্তানের অনুরোধের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেন। পাকিস্তান—যারা এই বিরোধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে—ট্রাম্পকে তাঁর নির্ধারিত রাত ৮টার সময়সীমা থেকে সরে আসার আহ্বান জানায়। তাদের প্রস্তাব ছিল, উভয় পক্ষ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং এই সময়ের মধ্যে ইরান নিশ্চিত করবে যে তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ এই অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক অভিযান বন্ধ করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানান, ইরান তাদের “প্রতিরক্ষামূলক অভিযান” স্থগিত রাখবে এবং ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে “দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে”। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেন যে ইজরায়েলও এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা স্থগিত রাখবে।
সংঘাতের পটভূমি
এই সংঘাতের শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যখন আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের ওপর ব্যাপক সামরিক আক্রমণ শুরু করে। মঙ্গলবার সারাদিন পরিস্থিতি ছিল চরম অনিশ্চিত, আদৌ কোনও সমাধান বেরোবে কি না, এমনকি কোনো আলোচনা চলছে কি না, তা-ও স্পষ্ট ছিল না।
একপর্যায়ে ট্রাম্প বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকি দেন যা আন্তর্জাতিক আইনে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইরান পরোক্ষ আলোচনায় অংশগ্রহণও বন্ধ করে দেয়। ট্রাম্প এর আগে সতর্ক করেছিলেন, “আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনও ফিরে আসবে না”—যদিও তিনি একই সঙ্গে বলেছিলেন “হয়তো কোনও অলৌকিকভাবে ভালো কিছু ঘটতে পারে।”
রাত ৮টার সময়সীমার আগে আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের ওপর হামলা আরও জোরদার করে, সেই সময়ই পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি আনতে তীব্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
কূটনীতির নেপথ্যে
ইরান পাকিস্তানের প্রস্তাব মেনে নেয় একাধিক তড়িঘড়ি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর, যেখানে পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা নেয় এবং শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র চীনও হস্তক্ষেপ করে—এমনটাই জানিয়েছেন তিনজন ইরানি কর্মকর্তা। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি নিশ্চিত করে এবং এটিকে নিজেদের জয় হিসেবে তুলে ধরে, দাবি করে যে আমেরিকা তাদের শর্ত মানতে বাধ্য হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে জানান, এই যুদ্ধবিরতি শুধু ইরান-আমেরিকা সংঘাতেই নয়, লেবাননেও কার্যকর হবে যেখানে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইজরায়েলের সংঘর্ষ চলছিল। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি “লেবাননসহ সর্বত্র” প্রযোজ্য।
বাজারে স্বস্তি
যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম নেমে আসে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলারে। বুধবার সকালে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও উৎসাহজনক চিত্র দেখা যায়—জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচারও ২ শতাংশের বেশি উঠেছে।
অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি
তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশ—কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইজরায়েল—মিসাইল ও ড্রোন হামলার খবর দেয়। এগুলো যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙে চালানো হয়েছিল কি না, নাকি নতুন নির্দেশ নিচু স্তরের বাহিনীর কাছে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছিল তা তখনও স্পষ্ট হয়নি।
এই যুদ্ধবিরতি উভয় পক্ষকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এগোনোর সুযোগ দিয়েছে। তবে দুই সপ্তাহ পর আলোচনা কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
(এই প্রতিবেদন পরবর্তীতে আরও সম্প্রসারিত করা হবে। চোখ রাখুন বাংলাস্ফিয়ারে)