Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: নতুন আসা ডেডলাইন আর বারবার সেই ডেডলাইনের পিছিয়ে যাওয়া—মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এটাই এখনকার চেনা ছবি। গত রবিবার ইস্টার সানডেতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তাঁর কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাঁর সাফ কথা: ইরান যদি অনতিবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তবে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। প্রেসিডেন্টের মুখে এমন আক্রমণাত্মক ও অশালীন ভাষা কূটনৈতিক মহলে আগে কখনও শোনা যায়নি। ওয়াশিংটন সময় সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত দেওয়া সময়সীমা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আরও একদিন বাড়িয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত করা হয়েছে।
কূটনীতির দাবার চাল ও ব্যর্থতার শঙ্কা
যুদ্ধের দামামার মধ্যেই পর্দার আড়ালে চলছে কূটনীতির চেষ্টা। বাজার খোলার ঠিক আগেই সোমবার প্রশাসন ইঙ্গিত দেয়, তারা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আরেকটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, শুরুতে দুই থেকে তিন সপ্তাহের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতি হবে, যার বিনিময়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে। এই সময়টুকুকে কাজে লাগিয়ে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটা হবে।
তবে এই প্রস্তাব নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কারণ খুব কম। ইরানের সোজা কথা—তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালীই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের সাময়িক স্বস্তির বদলে তারা ট্রাম্পকে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো সুবিধা দিতে রাজি নয়। সোমবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইরান এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও ট্রাম্পের দাবি, “ওপক্ষ চুক্তি করতে অত্যন্ত আগ্রহী।”
প্রচারের যুদ্ধ বনাম মাটির বাস্তবতা
সংঘাত এখন ষষ্ঠ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। ১৫ হাজারেরও বেশি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং ৫ হাজারের বেশি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পুরো অঞ্চল এখন ধ্বংসস্তূপ। অথচ দুই পক্ষই নিজেদের ‘জয়ী’ হিসেবে দাবি করছে।
সম্প্রতি ইরানের ভেতরে ভূপাতিত একটি মার্কিন F-15 যুদ্ধবিমানের দুই পাইলটকে উদ্ধারের ঘটনাকে আমেরিকা একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। শত্রুপক্ষের ডেরায় ঢুকে কোনো প্রাণহানি ছাড়াই সেনাসদস্যদের ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচয়। অন্যদিকে, ইরান তাদের আধা-সামরিক বাহিনী নামিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও পাইলটদের ধরতে না পেরে কিছুটা বিব্রত।
তবে এই অভিযানে আমেরিকার ক্ষতিও কম নয়। কয়েকটি বিমান বালিতে আটকে গিয়ে নষ্ট হয়েছে এবং শত্রুর হাতে যাতে না পড়ে সেজন্য মার্কিন কমান্ডোরা সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ একটি পোড়া বিমানের ছবি পোস্ট করে বিদ্রূপ করে বলেছেন, “আমেরিকা যদি এমন আরও তিনবার জেতে, তবে তাদের দেশই ধ্বংস হয়ে যাবে।”
যুদ্ধের আকাশছোঁয়া চড়া মূল্য
কাগজে-কলমে আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতি তাদের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেটের (প্রায় ০.০৩ শতাংশ) তুলনায় নগণ্য মনে হতে পারে। ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সরঞ্জাম খোয়ানো তাদের জন্য বড় কিছু নয়। কিন্তু উদ্বেগের জায়গা হলো—আমেরিকার উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইল এবং দূরপাল্লার অস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কাতার ও সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিগুলোও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট:
উপসাগরীয় দেশগুলো (কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত) বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার ভান করলেও তাদের তেল শোধনাগার ও শিল্প কারখানাগুলো ইরানি হামলায় বিপর্যস্ত।
• অর্থনীতি: পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য তলানিতে ঠেকেছে। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে গ্রাহক উপস্থিতি মাত্র ১৫-২০ শতাংশ।
• নিরাপত্তা: দুবাই বা রিয়াদের মতো শহরগুলো, যা একসময় বিনিয়োগের নিরাপদ স্বর্গ ছিল, এখন ভুতুড়ে শহরে পরিণত হচ্ছে। সৌদি আরব তাদের প্রধান আর্থিক কেন্দ্রগুলো খালি করে দিয়েছে।
খাদের কিনারায় ইরান
ইরানের অবস্থা আরও শোচনীয়। ট্রাম্প কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বললেও, গত এক মাসে আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রধান ইস্পাত কারখানা, গ্যাসক্ষেত্র এবং শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল, এখন মুদ্রাস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ইস্পাত উৎপাদন (যা তাদের আয়ের অন্যতম উৎস) স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে।
শেষ কথা: পরিণতি কী?
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। ট্রাম্প যদি সত্যিই ইরানের বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংস করে দেন—যা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে—তবে ইরানও পাল্টা উপসাগরীয় অঞ্চলের জলশোধনাগারগুলোতে হামলা চালাবে। পানি আর বিদ্যুৎ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের এই আধুনিক শহরগুলো কয়েক দিনেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্ত বদলান কি না সেটা পরের বিষয়, কিন্তু এই ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ অঞ্চলটিকে যে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার চড়া মূল্য দিতে হবে আরও বহুকাল।