Home খবর SIR বিতর্ক: ভোটাধিকারের প্রশ্ন, নাকি শাসনের ব্যর্থতা ঢাকার কৌশল?

SIR বিতর্ক: ভোটাধিকারের প্রশ্ন, নাকি শাসনের ব্যর্থতা ঢাকার কৌশল?

পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে 'ইস্যু বদলের' পুরনো খেলা নতুন রূপে

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ইস্যু তৈরি করা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে আড়াল করার যে কৌশল, তা এবার এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আসন্ন নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগ্র প্রচারাভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটিই বিষয় — SIR বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এটি নিছক প্রশাসনিক বিতর্ক নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল যার লক্ষ্য গত পনেরো বছরের শাসনকালের অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোকে আলোচনার বাইরে সরিয়ে দেওয়া।

পনেরো বছরে কী হয়নি

রাজ্যে কর্মসংস্থানের সঙ্কট ক্রমশ গভীর হয়েছে। শিল্প বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। কৃষিক্ষেত্রে স্থায়ী কাঠামোগত সংস্কার আজও অধরা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ — শিক্ষা নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে কয়লা ও গবাদিপশু পাচার যা রাজ্য প্রশাসনের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নির্বাচন হলে লড়াইটা হতো শাসনের পারফরম্যান্স বনাম জনঅসন্তোষের। সেই লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা শাসক দলের পক্ষে কঠিন হত, এ কথা তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব ভালো করেই জানে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

SIR: ‘পারফেক্ট ডিস্ট্র্যাকশন’

এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা SIR একটি কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে পুরো নির্বাচনী আলোচনার গতিপথ বদলে দেওয়া হয়েছে। এখন আর আলোচনার কেন্দ্রে নেই — চাকরি কোথায়, শিল্প কেন নেই, দুর্নীতির দায় কার। বরং আলোচনা ঘুরে গেছে — ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, গণতন্ত্র আক্রান্ত কি না, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি নিরপেক্ষ কি না। রাজনীতিতে প্রশ্ন বদলানোই সবচেয়ে বড় কৌশল — এবং সেই কৌশলই এবার প্রয়োগ হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।

মনস্তত্ত্বের রাজনীতি

এই প্রচারকৌশলের ভেতরে কাজ করছে একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ। সাধারণ মানুষ যখন নিজের মৌলিক অধিকারের ওপর হুমকি অনুভব করেন যেমন ভোট দেওয়ার অধিকার, তখন তাঁর মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই অন্য সব বিষয় থেকে সরে যায়। বেকারত্ব, ভাঙা রাস্তা বা হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাব — এই সব প্রশ্ন তখন দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়। প্রথম প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়: “আমি ভোট দিতে পারব তো?” এই একটিমাত্র প্রশ্নই যথেষ্ট পুরো রাজনৈতিক আলোচনাকে পুনর্গঠন করার জন্য।

একই বার্তার পুনরাবৃত্তি

মুখ্যমন্ত্রীর প্রচারসভাগুলিতে এই বিষয়টির ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি লক্ষ্যণীয়। প্রতিটি সভায়, প্রতিটি বক্তব্যে একই সতর্কবার্তা — নাম কাটা যাচ্ছে, আপিল করুন, ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যেন পুরো রাজ্য এক বিশাল বিপদের মুখোমুখি। এই পুনরাবৃত্তির পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য — একটি বিশেষ ভয় তৈরি করা এবং সেই ভয়কে কেন্দ্র করে সমর্থকদের একত্রিত রাখা। ভয় এবং পরিচয়ের রাজনীতি , ইতিহাস সাক্ষী, এই দুইয়ের সংমিশ্রণই নির্বাচনী প্রচারে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

যে নীরবতা প্রশ্ন তোলে

তবে এই প্রচারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো একটি গভীর, অস্বস্তিকর নীরবতা। শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই, যে কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার তরুণের ভবিষ্যৎ আজও অনিশ্চিত। শিল্পহীনতার প্রশ্নে নীরবতা যেখানে রাজ্যের অর্থনীতি ক্রমশ পরিষেবানির্ভর হয়ে পড়ছে। আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে নীরবতা যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা প্রায় একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই সমস্ত ইস্যু যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে প্রচারের আলো থেকে।

শাসক দলের আত্মবিরোধ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিতে একটি আত্মবিরোধও চিহ্নিত করছেন। যে সরকার পনেরো বছর ধরে রাজ্যের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেই সরকারই এখন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সবচেয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলছে। যে নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কাজ করেছে, সেই নেতৃত্বই এখন সেই কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না বলে দাবি করছে। এই দ্বৈত অবস্থান নির্বাচনী কৌশলের দিক থেকে সুবিধাজনক হলেও, এটি একটি স্পষ্ট আত্মবিরোধিতাও প্রকাশ করে।

রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিচিত ছক

এই কৌশল অবশ্য সম্পূর্ণ নতুন নয়। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখন কোনো সরকার পারফরম্যান্সের প্রশ্নে চাপে পড়েছে, তখন সে ন্যারেটিভ শিফট করার চেষ্টা করেছে — একটি নতুন, বেশি আবেগপ্রবণ ইস্যুকে সামনে এনে পুরনো প্রশ্নগুলোকে আড়াল করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্যাটার্নেরই একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ।

ভোটের দিন কোন স্মৃতি জেগে উঠবে?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে? ভোটাররা কি সত্যিই ভুলে যাবেন গত পনেরো বছরের শাসনকালীন অভিজ্ঞতা? নাকি বুথে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁদের রায় নির্ধারণ করবে? রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, মানুষ কখনও পুরোপুরি ভোলে না, আবার সবসময় সবকিছু মনেও রাখে না। ফলে এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে কোন স্মৃতিটা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে — ভোটাধিকার হারানোর ভয়, না কি দীর্ঘ শাসনকালের প্রতি জমে থাকা অসন্তোষ।

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। আর এই দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করবে SIR কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক সঙ্কটের প্রতীক, নাকি কেবলমাত্র একটি সুচারু রাজনৈতিক পর্দা, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles