বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের বিরুদ্ধে আকাশযুদ্ধে এতদিন পর্যন্ত আমেরিকার ভাগ্য যেন বেশ সহায়ই ছিল। ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে তারা হারিয়েছিল ২৮টি যুদ্ধবিমান। সেই সঙ্ঘাতে ইরাক ১৬ জন পাইলট ও বিমানসেনাকে যুদ্ধবন্দী করতে পেরেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতি ছিল নামমাত্র। একমাত্র ব্যতিক্রম, কুয়েতে ভুলবশত নিজেরাই নিজেদের বিমান ক্ষতিগ্রস্ত করা।
হঠাৎ সেই সৌভাগ্য রেখায় ছেদ পড়ল গত ৩ এপ্রিল।বিশ্বকে কম-বেশি স্তম্ভিত করে সেদিন আমেরিকার একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানকে ইরান ভূপাতিত করে দিল।একজন পাইলটকে অনতিবিলম্বে উদ্ধার করা গেলেও অন্যজনকে উদ্ধার করতে কালঘাম ছুটে গিয়েছে দৃশ্যতই। অন্য একটি ঘটনায় একটি এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধ- বিমানও হরমুজ প্রণালীর কাছে ভেঙে পড়ে যায় যদিও তার একমাত্র পাইলটকে উদ্ধার করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি।যদি ইরান কোনও মার্কিন বিমানচালককে জীবিত অবস্থায় যুদ্ধবন্দী করতে পারে তাহলে এই যুদ্ধ যা থামার কোনও লক্ষণই দেখাচ্ছে না, আরও তীব্রতর চেহারা নেবে কতকটা অনিবার্যভাবেই।
পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে আমেরিকা ১২,০০০-এরও বেশি বার ইরানে হানা দিয়েছে। প্রায় সমসংখ্যক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল, যা আকাশ ও স্থল উভয় লক্ষ্যেই হামলা চালাতে পারে, সম্ভবত জর্ডান থেকে উড়ে এসে এই হামলাগুলোর বড় অংশ সম্পন্ন করেছে, অনেক সময় খুব কাছ থেকে বোমা ফেলেছে।
ঐতিহাসিক মানদণ্ডে আমেরিকার বিমান ক্ষয়ক্ষতির হার অত্যন্ত কম। ইরানের অধিকাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু সব নয়।কিছু কিছু ব্যবস্থা হঠাৎ সক্রিয় হয়ে সুযোগ বুঝে আঘাত হানতে পারে। এছাড়াও যান্ত্রিক ত্রুটির মতো অন্যান্য কারণেও যে কোনও বিমান যে কোনও সময়ে শত্রুপুরীতে ভেঙেই পড়তে পারে।তবে সর্বশেষ ঘটনাটির পরে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস-ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা তাসনিম দাবি করেছে, তাদের বাহিনীই বিমানটি গুলি করে নামিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবিতে ডানার ও লেজের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে, যা ইংল্যান্ডের আরএএফ লেকেনহিথ ঘাঁটি থেকে ওড়া কোনও বিমানের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।সঙ্গে মাটিতে পড়ে থাকা একটি খালি ইজেকশন সিটও দেখা গেছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি এইচসি-১৩০ পরিবহন বিমান যা বিশেষভাবে তৈরি এবং এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার, দুটিই উদ্ধার অভিযানের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান অঞ্চলের আকাশে দিনের আলোতে নিচু উচ্চতায় উড়ছে, যা নিকটতম মিত্র ঘাঁটি কুয়েত থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে। এইচসি-১৩০ আকাশে কমান্ড পোস্ট, যোগাযোগ রিলে ও জ্বালানি সরবরাহের কাজ করে, হেলিকপ্টারগুলো ভূপাতিত পাইলটদের তুলে আনে। এক্ষেত্রে আমেরিকা সফল হলেও এই ধরণের উদ্ধার অভিযান নিজেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই উড়োজাহাজগুলো ছোট অস্ত্র ও কাঁধে বহনযোগ্য রকেটের আঘাতেই ভেঙে পড়তে পারে। কিছু মার্কিন ও ইরানি সংবাদমাধ্যম বলছে, উদ্ধার অভিযানে যুক্ত একটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার সম্ভবত গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, যদিও সেটি ইরাকের আকাশসীমায় ফিরে যেতে পেরেছে। একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, তার ক্রুরা নিরাপদ আছে।
স্ট্রাইক ঈগল বিমানে থাকে একজন পাইলট ও একজন সহকারী যার কাজ লক্ষ্যবস্তু দৃশ্যমান হলেই বোমার সুইচ টিপে দেওয়া। অস্ত্র-ব্যবস্থা অপারেটর থাকে। দ্বিতীয় ক্রু সদস্যের ভাগ্য বেশ কিছুক্ষণ অনিশ্চয়তায় ঝুলছিল। তখন ইরান ঘোষণা করে যারা ভূপাতিত ক্রুদের খুঁজে পাবে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে।এমনও খবর রটেছিল , সাধারণ মানুষকে নাকি বলা হয়েছে—“দেখামাত্র গুলি করুন”।
ইতিহাসে বহুবার ধরা পড়া পাইলটরা আমেরিকার যুদ্ধের কাহিনির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ৫০০ বিমানসেনাকে উত্তর ভিয়েতনাম বন্দি করেছিল; তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিলেন জন ম্যাককেইন, যিনি পরে সেনেটর ও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হন। ১৯৮৩ সালে লেবাননে একজন মার্কিন নেভিগেটরকে সিরীয় বাহিনী বন্দি করে ৩০ দিন ধরে আটকে রাখে, পরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা হয়। ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেন ভূপাতিত মার্কিন পাইলটদের প্রচারযুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, তাদের দিয়ে যুদ্ধবিরোধী ভিডিও বার্তা রেকর্ড করিয়ে টেলিভিশনে দেখানো হয়েছিল।
শান্তিকালেও ইরান মার্কিন নাগরিকদের আটক করেছে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস থেকে কূটনীতিকদের আটক করা হয়েছিল,তারা যুদ্ধবন্দী নয় পণবন্দী ছিলেন। আবার ২০১৬ সালে পারস্য উপসাগরের ফারসি দ্বীপের কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর ১০ জন সদস্যকে আইআরজিসি আটক করে। যদিও তাদের এক দিনেরও কম সময় আটকে রাখা হয়েছিল, কিন্তু হাঁটু গেড়ে বসে মাথায় হাত রাখা অবস্থায় তাদের ছবি তুলে প্রকাশ করা হয়, যা ছিল অপমানজনক।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতাদের ভাষা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানের প্রতি “ দয়া অথবা ক্ষমা” দেখানো হবে না।তিনি “আকাশ থেকে সারাদিন মৃত্যু ও ধ্বংস নামিয়ে আনার” কথা বলে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১ এপ্রিলের এক ভাষণে বলেন তিনি ইরানকে “ প্রস্তর-যুগে ফিরিয়ে দেবেন, যেখানে তাদের থাকা উচিত।” এই ধরনের ভাষা কোনো বন্দীর জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলতেই পারে।
যদি ইরান কোনও মার্কিন অফিসারকে বন্দী করতে পারে তা হবে এক শক্তিশালী দরকষাকষির হাতিয়ার। ট্রাম্প তার ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধ হয়তো আর দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলবে। যদি ইরান কোনও যুদ্ধবন্দীকে টেলিভিশনে দেখায়—যা জেনেভা কনভেনশনের বিরোধী—তাহলে হরমুজ প্রণালীর উপর তাদের কড়া নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এটি তাদের প্রভাব আরও বাড়াবে। পাইলটের অবস্থান বা ভাগ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ না করাও তাদের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। ৩ এপ্রিল ইরান জানিয়েছে, ইসলামাবাদে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় তারা অংশ নিতে রাজি নয় এবং আমেরিকার দাবিগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।
যদি নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা না যেত তাহলে তা আমেরিকানদের অস্বস্তি ও ক্রোধ সমান মাত্রায় বাড়িয়ে দিত যা ট্রাম্পের অস্থির স্নায়ুতন্ত্রকে আর অস্থির করে তুলতই। তবে একথাও ঠিক এমন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেউই বড় ধরণের সামরিক বিপর্যয় বলে ভাবতোনা।যেমন ১৯৯৯ সালে সার্বিয়া একটি মার্কিন স্টেলথ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল, কিন্তু যুদ্ধের ফলাফলে তেমন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু যদি কোনও মার্কিন বিমানসেনা ইরানের হাতে বন্দী হয়, তাহলে তা আমেরিকার জনমনে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করবে এবং সম্ভবত ট্রাম্পকে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করবে যাতে ইরানকে চাপ দিয়ে বন্দিকে ফিরিয়ে আনা যায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণাক্ত জলের শোধনাগার ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন। ২ এপ্রিল আমেরিকা ইরানের উত্তরে নির্মীয়মাণ একটি সেতু ধ্বংস করেছে, এবং ট্রাম্প দাবি করেছেন সেটিই দেশের সবচেয়ে বড় সেতু ছিল। সব মিলিয়ে চলমান যুদ্ধে কখন কী অঘটন ঘটে যায় কেউ তার আগাম হদিশ দিতে পারেনা।