শুক্রবার ইরান ও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান ও উপসাগরীয় আকাশসীমায় দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। দু’জন পাইলটকে উদ্ধার করা গেলেও তৃতীয় একজন এখনও নিখোঁজ এবং তাকে খুঁজে বের করার জন্য ইরানের বাহিনী তল্লাশি চালাচ্ছে।
এই ঘটনাগুলি দেখিয়ে দিচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বারবার আকাশসীমায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও, ইরানের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমানের ঝুঁকি এখনও কতটা প্রবল রয়ে গেছে।
প্রথম বিমানটি ছিল দুই আসনবিশিষ্ট মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান, যা ইরানের গুলিতে ভূপাতিত হয়েছে।দুই দেশের কর্মকর্তারাই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দ্বিতীয় বিমানটি ছিল এ-১০ “ওয়ারথগ” যুদ্ধবিমান যা ইরানের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কুয়েতের আকাশসীমায় ভেঙে পড়ে। ওই বিমানের পাইলট প্যারাসুটে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন, বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
নিখোঁজ পাইলটকে খুঁজতে গিয়ে দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টারও ইরানের গুলির মুখে পড়ে, যদিও সেগুলি শেষ পর্যন্ত ইরানের আকাশসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
বিমানগুলির পাইলটদের আঘাতের মাত্রা সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট তথ্য জানা যায়নি। এফ-১৫ই বিমানের যে পাইলট নিখোঁজ তার অবস্থান বা পরিস্থিতি এখনও প্রকাশ্যে জানা যায়নি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের যে এলাকায় বিমানটি ভেঙে পড়েছে, সেখানে তারা তল্লাশি চালাচ্ছে। স্থানীয় গভর্নর ঘোষণা করেছেন, “শত্রু বাহিনীর” কাউকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন বিমান হামলায় ক্ষতবিক্ষত ইরানের সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে এই বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করেছে। ইরানের সংসদের স্পিকার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যুদ্ধ এখন “শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে নেমে এসে পাইলট শিকারে পরিণত হয়েছে।”
এদিকে, হোয়াইট হাউসে বসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিখোঁজ পাইলটকে খোঁজার উদ্ধার অভিযানের আপডেট নিচ্ছেন বলে এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে পেন্টাগন ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
একজন মার্কিন সেনা সদস্য জীবিত অবস্থায় ইরানের ভিতরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এই সম্ভাবনাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন এক যুদ্ধে যার প্রতি দেশের ভিতরে জনসমর্থন কম এবং যার দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই, এই ঘটনা বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরান ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে প্রস্তুত নয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির যে প্রচেষ্টা চলছিল, সেটিও কার্যত ভেস্তে গেছে বলে শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে।
এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল আমেরিকা ও ইজরায়েলের একযোগে বিমান হামলার মাধ্যমে, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন। এই সংঘাতে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০-রও বেশি আহত হয়েছেন বলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে।
ইরানও পাল্টা হিসেবে ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে আমেরিকার মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলিকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে যদিও সেই দেশগুলি এখনও সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কায়।
শুক্রবার এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় বেইরুটে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি লেবাননের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে লক্ষ্য করতে পারে। তাই সেখানে থাকা মার্কিন নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে ইজরায়েলের ওপর ওপর হামলা চালানোর পর, ইজরায়েলও লেবাননে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে।
শুক্রবার, যখন ট্রাম্প ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন ইরান কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ ও জলশোধনাগারে হামলা চালায়। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, উপসাগরীয় দেশগুলি কতটা ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।কারণ তারা পানীয় জলের জন্য ব্যাপকভাবে লবণাক্ত জল শোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় তেহরান ও কাছাকাছি কারাজ শহরের মধ্যে নির্মীয়মাণ বি-১ সেতুতে মার্কিন হামলার ফলে ধুলো ও ধোঁয়া উড়ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এর পর আরও বড় হামলা আসবে।
তিনি লেখেন, “আমাদের সামরিক বাহিনী—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী।এখনও ইরানে যা অবশিষ্ট আছে, তা ধ্বংস করাই শুরু করেনি। এবার সেতু, তারপর বিদ্যুৎকেন্দ্র!”
শুক্রবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর প্রদেশের চোগাদাক এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের একটি ত্রাণ গুদামেও ড্রোন হামলা হয়েছে।
কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন জানিয়েছে, তাদের মিনা আল-আহমাদি তেল শোধনাগারেও ড্রোন হামলা হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরব ও আবুধাবিতেও আরও কিছু হামলা প্রতিহত করা হয়েছে বলে খবর।
ইজরায়েলের হাইফা বন্দরের কাছেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে।এখানেই রয়েছে একটি বড় তেল শোধনাগার।
তেলের বাজার শুক্রবার বন্ধ থাকলেও, বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের বক্তব্যের পর মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ১১% বেড়ে যায়। তার বক্তব্যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত না থাকায় বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।