ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি দাবি করেছেন, দেশের মাওবাদী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ছাড়া প্রায় সব শীর্ষ নেতা নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে “নিকেশ” হয়েছে। এই মন্তব্য শুধু একটি সাফল্যের ঘোষণা নয়, বরং গত এক দশকের ধারাবাহিক সশস্ত্র অভিযানের একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংক্ষিপ্তসার হিসেবেও ধরা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে, কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যের যৌথ নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে গত কয়েক বছরে মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিশেষত ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং মহারাষ্ট্রের জঙ্গলাঞ্চলে পরিচালিত “এলাকা দখল” এবং গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অভিযান চালানো, আধুনিক ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, এবং স্থানীয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়—এই কৌশলগত পরিবর্তনই গত কয়েক বছরে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
অমিত শাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাওবাদীদের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। একসময় যে সংগঠনটি সুসংহত নির্দেশ-শৃঙ্খলা মেনে চলত, এখন সেখানে নেতৃত্বের অভাব, যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা এবং আঞ্চলিক ইউনিটগুলির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর ফলে বড় আকারের হামলা চালানোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে—এমনটাই দাবি কেন্দ্রীয় সরকারের।
তবে এই ঘোষণার মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে দেশকে “মাওবাদমুক্ত” করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যপূরণের পথে এই দাবিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্য প্রদর্শন করাও এই ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ এই দাবিকে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন। তাঁদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি নিঃসন্দেহে বড় আঘাত, কিন্তু মাওবাদী আন্দোলনের শক্তি শুধুমাত্র নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়—তা গ্রামীণ ও বনাঞ্চলভিত্তিক সামাজিক নেটওয়ার্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বহু অঞ্চলে এখনও তাদের প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে যেখানে প্রশাসনিক উপস্থিতি দুর্বল এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনা প্রকট। ফলে নেতৃত্ব দুর্বল হলেও আন্দোলনের সম্পূর্ণ অবসান হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই তাড়াহুড়ো হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “শেষ প্রান্তের বিদ্রোহ”—অর্থাৎ সংগঠনের শীর্ষ স্তর ভেঙে পড়লেও নিচুতলার কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ছোট ছোট গেরিলা ইউনিটে সক্রিয় থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে বরং অনিয়মিত কিন্তু আকস্মিক আক্রমণের রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, অমিত শাহের এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে সরকারের নিরাপত্তা কৌশলের একটি বড় সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করে। তবে এটিকে চূড়ান্ত পরিণতি বলা যায় না—বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যার পরেই নির্ধারিত হবে মাওবাদী আন্দোলন সত্যিই শেষের পথে, নাকি নতুন কোনও রূপে আবারও আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করবে।