এই মাসে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল স্বীকার করেন যে, তাঁর সরকার গোপনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, এই আলোচনার নেতৃত্বে রয়েছেন “বিপ্লবের ঐতিহাসিক নেতা”।
এই বিশেষ উপাধিটি সাধারণত রাউল কাস্ত্রোকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তিনি তাঁর ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর পর ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, যাতে মিগেল দিয়াজ-কানেলের নেতৃত্বে একটি “নাগরিক শাসন”-এর ভাবমূর্তি তৈরি করা যায়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তেলের অবরোধে কিউবার অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে, এবং মানবিক সংকট ক্রমশ গভীর হওয়ায়, কাস্ত্রো পরিবারের সদস্যরা আবারও সামনে আসতে শুরু করেছেন।
পরিবারের একজন সদস্য সরাসরি মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন। আরেকজন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে, পরিবারের আরেক সদস্য নতুন এক নীতির মুখ হয়ে উঠেছেন—যেখানে প্রবাসী কিউবানদের দেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
……………….
এই পরিবর্তন স্পষ্ট করে যে, কাস্ত্রো পরিবার কখনও পুরোপুরি রাজনীতি থেকে সরে যায়নি; বরং সময়ের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ও ভূমিকা বদলে নিয়েছে।
এমনকি যখন ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার উপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলকে সরানোর দাবি তুলছে, তখনও দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার মুখে থাকা এই পরিবার নতুন প্রজন্মের কাস্ত্রোদের দেশের প্রকৃত ক্ষমতাধারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ আন্দ্রেস পার্তিয়েরা মন্তব্য করেন,
“এটি এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে ‘ডি-কাস্ত্রোফিকেশন’ দেখানো হবে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা থেকে যাবে তাদের হাতেই—অর্থাৎ ১৯৫৯-পরবর্তী অভিজাত গোষ্ঠীর কাছেই।”
……………………….
১৯৫৯ সাল থেকেই কাস্ত্রো পরিবার কিউবার ভাগ্য নির্ধারণ করে আসছে। সেই সময় ফিদেল কাস্ত্রো এবং রাউল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পুরনো শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করে।
এরপর তারা কিউবাকে সোভিয়েত প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই দ্বীপটিকে ঠান্ডা যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করে।
ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন বিপ্লবের ক্যারিশম্যাটিক সর্বোচ্চ নেতা। অন্যদিকে, রাউল কাস্ত্রো তুলনামূলকভাবে নীরব থেকে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করেন।
………………..
কাস্ত্রো ভাইদের শাসনামলে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে—সিআইএ-র হত্যার ষড়যন্ত্র, দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন।
পরবর্তীতে ভেনেজুয়েলা কিউবার প্রধান তেল সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে। এর ফলে কিউবায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
…………………
এই মার্কিন তেল অবরোধের উদ্দেশ্য হলো এমন একটি সরকার গঠন করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের দাবির প্রতি আরও নমনীয় হবে—যেমনটি ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর দেখা গিয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে মার্কো রুবিও বলেন,
“বর্তমান নেতৃত্ব সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন।”
…………………
তবে কাস্ত্রোদের ক্ষমতা থেকে সরানো এত সহজ নয়।
৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো এখনও পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি পদ ছাড়লেও তাঁর প্রভাব এখনো প্রবল—বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি জিএইএসএ নামে একটি বিশাল সামরিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন, যা বর্তমানে কিউবার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। (চলবে)