Home খবর মমতাকে মারার ষড়যন্ত্র, খানিক কমিক রিলিফ

মমতাকে মারার ষড়যন্ত্র, খানিক কমিক রিলিফ

0 comments 0 views
A+A-
Reset

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নাটকীয়তার অভাব কখনও ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিকতম সংযোজনটি যেন পুরোনো মঞ্চে নতুন আলো।মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, তাঁকে খুন করার চক্রান্ত চলছে। অভিযোগের তীর বিজেপির দিকে হলে তবু বা কথা ছিল, নাম না করে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি কাঠগড়ায় তুলেছেন। এই বক্তব্য এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে এল যেখানে প্রতিটি নির্বাচন, প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ, এমনকি প্রতিটি মাইক-বাজানো সভাও এক ধরনের অবিশ্বাস, আতঙ্ক এবং কল্পনার মিশ্রণে পরিণত হয়েছে।

 

প্রথমে প্রশ্নটা সহজ: এই অভিযোগ কি রাজনৈতিক? না কি অস্তিত্বসংকটের ভাষা? নাকি দুয়ের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ, যেখানে বাস্তব আর নাটক হাত ধরাধরি করে চলে?

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু বছর ধরেই নিজেকে “সংগ্রামী নেত্রী” হিসেবে নির্মাণ করেছেন। এমন এক নেত্রী যিনি রাস্তায় লাঠি খেয়েছেন, পুলিশি অত্যাচার সহ্য করেছেন, এবং ‘সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে একা লড়েছেন। সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত এতটাই দৃঢ় যে বিপদ—বাস্তব হোক বা কল্পিত—তাঁর বয়ানে সবসময় কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু এখন যখন তিনি নিজেই সেই ‘সিস্টেম’-এর প্রধান, তখন এই বিপদের গল্পটা যেন খানিক বেমানান শোনায়। যেন ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি নিজেকে এখনও অবরুদ্ধ দুর্গের বন্দী বলে মনে করছেন।

 

আবার মমতা বলেই এমন আজগুবি অভিযোগ তাঁকে মানিয়ে যায়।একদিকে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন তাঁর নিয়ন্ত্রণে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাঁর অধীন, আরেক দিকে তিনি বলছেন তাঁকে খুনের চক্রান্ত হচ্ছে।এ যেন সেই রাজা, যিনি নিজের প্রাসাদের ভিতরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছেন, “আমাকে বাঁচাও, আমার সৈন্যরা আমাকেই মারতে আসছে!”

 

অবশ্য এই বক্তব্যকে নিছক অদ্ভুত বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। কারণ, এর রাজনৈতিক উপযোগিতা অস্বীকার করা যায় না। যখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, তখন ‘ভয়’ একটি শক্তিশালী মুদ্রা। ভোটারদের মনে যদি এই ধারণা ঢোকানো যায় যে তাঁদের প্রিয় নেত্রী বিপদের মুখে, তাহলে সহানুভূতি, আবেগ এবং আনুগত্য, এই তিনটি প্রতিক্রিয়াই একসঙ্গে চাগিয়ে দেওয়া যায়। রাজনীতির ভাষায় একে বলে ভিকটিমহুড মোবিলাইজেশন, নিজেকে আক্রমণের শিকার হিসেবে তুলে ধরে জনসমর্থন জোগাড় করা।

 

কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ গত এক দশকে দেখেছেন কীভাবে প্রতিটি নির্বাচনকে ঘিরে হিংসা, দখলদারি, এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন শাসক নিজেই হঠাৎ করে ‘আক্রান্ত’ বলে চিল-চিৎকার করতে থাকেন, তখন প্রশ্নটা উল্টো দিক থেকেও আসে।এই ভয় কি বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নির্মিত?

 

আরও মজার বিষয় হল, এই অভিযোগের মধ্যে এক ধরনের নাটকীয় অতিরঞ্জন রয়েছে, যা প্রায় সিনেম্যাটিক। যেন কোনও থ্রিলার ছবির দৃশ্য,অন্ধকারে ফিসফিস করে বলা হচ্ছে, “ওকে সরিয়ে দিতে হবে” আর নায়িকা হঠাৎ বুঝতে পেরে জনতার সামনে এসে সেই ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিচ্ছেন দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি এতটা সরল চিত্রনাট্য মেনে চলে না। এখানে ষড়যন্ত্র থাকে, কিন্তু তার প্রমাণও থাকে। অভিযোগ থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকে তদন্ত, তথ্য, এবং যুক্তি।

 

এই জায়গাতেই মমতার বক্তব্য খানিক দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, যদি সত্যিই এমন কোনও মারাত্মক চক্রান্ত থাকে, তাহলে তা প্রকাশ্যে এনে তদন্তের দাবি তোলা উচিত। শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে দেওয়া,এটা বরং সন্দেহ বাড়ায়, কমায় না।

 

চমকপ্রদ পরিহাসটি লুকিয়ে আছে অন‍্যত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার বিরোধীদের ‘চক্রান্ত’ তত্ত্বকে তুচ্ছ করেছেন, তাঁদের অভিযোগকে “রাজনৈতিক নাটক” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। আজ তিনি নিজেই সেই একই ভাষা ব্যবহার করছেন,একই অভিযোগ, একই নাটকীয়তা। ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি যেন এক ধরনের কৌতুক,যেখানে চরিত্র বদলায়, কিন্তু সংলাপ একই থাকে।

 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকে যায়: এটা কি সত্যিই নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? উত্তর যাই হোক, এই বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির বর্তমান চিত্রটাকে স্পষ্ট করে দেয়—একটি এমন মঞ্চ, যেখানে বাস্তব আর নাটক, ভয় আর কৌশল, সত্য আর বয়ান—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

 

আর দর্শক? তারা বসে আছে, হাততালি দেবে না কি হেসে ফেলবে—সেই সিদ্ধান্ত নিতে নিতে।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles