বাংলাস্ফিয়ার: এক দশক আগে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের লড়াইয়ে মার্কো রুবিও সতর্ক করেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নেতৃত্বে সরকার মানেই হবে “অরাজকতা”। পাল্টা জবাবে ট্রাম্প তাঁকে বিদ্রূপ করে “লিটল মার্কো” বলে ডাকতেন।
এক দশক পর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে রুবিও এখন অনেকটাই সংযত ও বিনয়ী। শান্ত, সুস্পষ্ট এবং দক্ষ বক্তা হিসেবে তিনি ট্রাম্পের বিদেশনীতিতে একটি কাঠামো ও ধারাবাহিকতা যোগ করেছেন। একইসঙ্গে চলতি বছর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি যে আক্রমণাত্মক ও কঠোর অবস্থানে সরে এসেছে, তার অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক সক্রিয়তার পরিণতি ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার ক্ষেত্রে রুবিওর অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই রুবিও পরিচিত একজন লড়াকু হিসেবে। ২০১০ সালে সিনেট নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন গভর্নরের বিপরীতে ৩০ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত সহজ জয় পান। তাঁর প্রচারের কেন্দ্রে ছিল ব্যক্তিগত জীবনের গল্প — কিউবা থেকে আসা তাঁর বাবা-মা ইংরেজি জানতেন না, সঙ্গে ছিল না অর্থ। বাবা বারটেন্ডার, মা ক্যাশিয়ারের কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ফ্লোরিডা হাউসের স্পিকার হয়ে ওঠা রুবিও পরিণত হন আমেরিকার ‘অভিবাসী স্বপ্ন’-এর জীবন্ত প্রতীকে। ১৪ বছরের সিনেট কর্মজীবনে অর্জিত সম্মানের প্রতিফলন ঘটে ২০২৫ সালে, যখন তাঁকে ৯৯-০ ভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয়ে টিকে থাকতে রুবিওকে নিজেকে বদলাতে হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সিনেটর থাকাকালীন তিনি দ্বিদলীয় অভিবাসন সংস্কার এবং ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের পক্ষে সরব ছিলেন। অথচ এখন তিনি এমন এক প্রশাসনের অংশ, যেখানে গণহারে অভিবাসী বহিষ্কার এবং ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নীতির অংশ। ফলে তাঁর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। তবে সমর্থকদের দাবি, রুবিও বরং ট্রাম্পের অতিরিক্ত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। ইউরোপীয় দেশগুলো তাঁকে প্রশাসনের এমন একজন কর্মকর্তা হিসেবে দেখে, যাঁর সঙ্গে কাজ করা সম্ভব। এমনকি গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রসঙ্গে ট্রাম্পের চুপ হয়ে যাওয়ার পেছনেও রুবিওর ভূমিকার কথা বলছেন কেউ কেউ।
পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফর ছিল মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অভিবাসী প্রবাহ কমানো এবং ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নেওয়ার লক্ষ্যে। কিউবা প্রশ্নে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। শুধু নীতির পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন নেতৃত্বের বদল। মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র ইসরায়েলপন্থী রুবিও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।
নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অবশ্য আপাতত আড়ালে রাখছেন রুবিও। ২০২৮ সালে বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তিনি তাঁকেই সমর্থন দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে থাকলে ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। সেক্ষেত্রে রুবিও হয়তো কৌশলগতভাবে ২০২৮ সালে ভ্যান্সকে হারতে দিয়ে ২০৩২ সালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবেন। ততদিনে আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবেশ আবার বদলাবে — আর রুবিও, যেমনটা তিনি বরাবর করে এসেছেন, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবেন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।