বাংলাস্ফিয়ার: নেপালে এক নাটকীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই গ্রেফতারির সূত্রপাত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হওয়া তথাকথিত “Gen Z” দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সময় ৭৬ জন মানুষের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত থেকে।

 

কী ঘটেছিল?

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। মূলত তরুণ প্রজন্ম—বিশেষ করে ছাত্র ও প্রথমবার ভোটাররা—দুর্নীতি, বেকারত্ব, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক দায়মুক্তির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। এই আন্দোলন দ্রুতই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং “Gen Z protests” নামে পরিচিতি পায়।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গুলি, লাঠিচার্জ, সব মিলিয়ে সহিংসতা বাড়তে থাকে। সরকারি হিসেবে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়, যদিও আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

 

গ্রেফতার কেন?

এই মৃত্যুগুলির তদন্তে একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়। সেই কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার জন্য তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের দায় ছিল।

এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ২৮ মার্চ ২০২৬-এ কেপি শর্মা ওলি এবং রমেশ লেখককে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ—অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন।

 

রাজনৈতিক পালাবদল

এই ঘটনার পর নেপালের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ব্যাপক জনরোষের মুখে ওলি সরকার আগেই পদত্যাগ করেছিল। এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বালেন্দ্র শাহ, যিনি মূলত তরুণদের সমর্থন নিয়ে উঠে এসেছেন।

নতুন সরকার নিজেকে “অ্যাকাউন্টেবিলিটি” বা দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।

 

কেন এই আন্দোলন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই “Gen Z” আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দিক হলো তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। এত বড় সংখ্যায় যুব সমাজ আগে এভাবে সংগঠিত হয়ে রাস্তায় নামেনি। তারা শুধু সরকার বদল নয়, পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছে—স্বচ্ছতা, চাকরি, এবং ন্যায়বিচার।

এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে নেপালের নতুন ভোটাররা আর পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মেনে নিতে রাজি নয়।

 

ভারতের জন্য কী তাৎপর্য?

নেপাল ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত বিশেষভাবে নজর রাখছে যে বিষয়গুলির ওপর:

  • নেপালের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা
  • চীন-নেপাল সম্পর্কের সম্ভাব্য পরিবর্তন
  • সীমান্ত ও বাণিজ্য পরিস্থিতি

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

নেপালের ইতিহাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তর, মাওবাদী আন্দোলন, বারবার সরকার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে দেশটি বহুবার সংকটের মুখে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ধারারই অংশ, যেখানে জনতার ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা মিলিয়ে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

 

সামনে কী?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই গ্রেফতারি কি সত্যিই বিচার প্রক্রিয়ার দিকে যাবে, নাকি আবার রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আটকে যাবে?

যদি সঠিক তদন্ত ও বিচার হয়, তাহলে নেপালের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, নেপাল এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে সিদ্ধান্ত নেবে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতি কতটা স্বচ্ছ, কতটা জবাবদিহিমূলক হবে।