Home সুমন নামা কবি যখন শাসকের তবলা বাদক হয় (৩)

কবি যখন শাসকের তবলা বাদক হয় (৩)

গপ্পোটা পরিষ্কার স্বার্থের অঙ্কের

by Suman Chattopadhyay
0 comments 7 views
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: যে কোনও সমাজে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান বোঝার সবচেয়ে নির্ভুল উপায় হলো তাদের কথার দিকে নয়, তাদের প্রণোদনার দিকে তাকানো। কে কী বলছে, তা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কেন বলছে, কোন পরিবেশে বলছে, এবং বললে তার কী লাভ-ক্ষতি হচ্ছে এই অঙ্কটাই শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ধারণ করে।

 

এই অঙ্ককে সরল করে ফেললে ভুল হবে। এটি কেবল টাকার হিসেব নয়। বরং এটি এক ধরনের বহুস্তরীয় “ইনসেনটিভ স্ট্রাকচার”যেখানে অর্থ, সম্মান, দৃশ্যমানতা, নিরাপত্তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সব একসঙ্গে কাজ করে।

 

এই অঙ্কের প্রথম স্তর—দৃশ্যমানতা।

আজকের সাংস্কৃতিক জগতে দৃশ্যমানতা নিজেই একটি মুদ্রা। কে কোথায় আমন্ত্রিত হচ্ছেন, কার লেখা কোথায় ছাপা হচ্ছে, কে কোন মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছেন এই সবই এক ধরনের সামাজিক পুঁজি তৈরি করে। এই পুঁজির সরাসরি আর্থিক মূল্য না থাকলেও, এর প্রভাব গভীর।

যখন একটি সরকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব, পুরস্কার, প্রকাশনা এই সবকিছুর উপর সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব রাখে, তখন এই দৃশ্যমানতার দরজাগুলিও আংশিকভাবে তার হাতেই চলে যায়। ফলে যে বুদ্ধিজীবী সেই নেটওয়ার্কের অংশ তার সামনে সুযোগের পথ খুলে যায়।

 

এখানে কোনও লিখিত চুক্তি থাকে না। কেউ বলে না,“এটা বললে এই সুযোগ পাবেন।” বরং এটি একটি নীরব বোঝাপড়া। আপনি জানেন, কোন অবস্থান আপনাকে আরও দৃশ‍্যমান করে তুলবে, আর কোন অবস্থান আপনাকে প্রান্তে ঠেলে দিতে পারে।

এই বোঝাপড়াই আচরণকে বদলে দেয়।

 

দ্বিতীয় স্তর—সম্মান ও স্বীকৃতি।

মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা হল—স্বীকৃতি। একজন কবি, লেখক বা শিল্পীর ক্ষেত্রে এই চাহিদাটি আরও প্রবল। তিনি চান, তার কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হোক, তাকে শোনা হোক, তাকে সম্মান করা হোক।

যখন এই সম্মান একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যে দিয়ে আসতে শুরু করে—পুরস্কার, কমিটি, সরকারি স্বীকৃতি—তখন সেই পরিসরের সঙ্গে একটি আবেগগত সম্পর্ক তৈরি হয়।

এই সম্পর্ক অনেক সময় এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সমালোচনা করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ সমালোচনা মানে শুধু একটি মতের বিরোধিতা নয়; এটি সেই সম্পর্ক সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা।

ফলে বুদ্ধিজীবী অনেক সময় নিজের মধ্যেই একটি সমঝোতা তৈরি করেন।আমি সবকিছু সমর্থন করছি না, কিন্তু সবকিছু সমালোচনাও করছি না।

এই “মাঝামাঝি” অবস্থানই ধীরে ধীরে একপাক্ষিকতায় গড়িয়ে যায়।

 

তৃতীয় স্তর—নিরাপত্তা।

এটি সবচেয়ে কম উচ্চারিত, কিন্তু সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রণোদনা।

একজন বুদ্ধিজীবী যদি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন, তাহলে তার সামনে কিছু বাস্তব ঝুঁকি থাকে—আইনি চাপ, প্রশাসনিক অসুবিধা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, এমনকি পেশাগত সুযোগের সংকোচন। এই ঝুঁকিগুলি সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু এগুলি যথেষ্ট বাস্তব।

ফলে অনেকেই একটি নিরাপদ পথ বেছে নেন।যেখানে তারা সরাসরি বিরোধিতা করেন না, আবার পুরোপুরি সমর্থনও করেন না। কিন্তু এই নিরাপদ পথে একটি ফাঁদ আছে।

কারণ এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আপনি বুঝতেই পারেন না, আপনি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন।

 

চতুর্থ স্তর—সামাজিক বৃত্তের চাপ।

একজন কবি বা লেখক একা থাকেন না। তার একটি বৃত্ত থাকে—বন্ধু, সহকর্মী, পাঠক, সম্পাদক, প্রকাশক। এই বৃত্তের মধ্যে একটি প্রাধান্যশীল মতামত তৈরি হলে, তার বিরুদ্ধে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কারণ এতে শুধু একটি রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া হয় না; এতে একটি সামাজিক অবস্থানও নেওয়া হয়।

আপনি যদি সেই বৃত্তের বিরুদ্ধে যান, তাহলে আপনি একা হয়ে যেতে পারেন। আপনার লেখা কম পড়া হবে, আপনার উপস্থিতি কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, আপনাকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি হবে।

এই সামাজিক চাপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর।

ফলে অনেকেই নিজের অবস্থানকে সেই বৃত্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলেন,কখনও সচেতনভাবে, কখনও অচেতনভাবে।

 

পঞ্চম স্তর—নৈতিক আত্মপ্রতারণা।

এটি সবচেয়ে জটিল স্তর।

একজন বুদ্ধিজীবী সাধারণত নিজেকে নৈতিকভাবে সচেতন মানুষ হিসেবে দেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তিনি সত্যের পক্ষে।

কিন্তু যখন তার অবস্থান ধীরে ধীরে একপাক্ষিক হয়ে ওঠে, তখন এই আত্ম-চিত্রের সঙ্গে বাস্তবতার একটি ফাঁক তৈরি হয়।

এই ফাঁকটিকে ঢাকতে তিনি নিজের কাছে কিছু যুক্তি খাড়া করেন।

যেমন—

“পরিস্থিতি এত সহজ নয়।”

“এখন এই প্রশ্ন তোলার ঠিক সময় নয়।”

“বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবতে হবে।”

এই যুক্তিগুলি সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়। কিন্তু এগুলি অনেক সময় একটি অস্বস্তিকর সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায়।

 

এ সবের বাইরে কিন্তু একটি বৃহৎ নাগরিক সমাজ আছে, ক্ষমতার আলোর ঝলকানিতে বুদ্ধি খাটিয়ে বুদ্ধিজীবী হওয়া লোকগুলো যার অস্তিত্বের কথা ভুলেই যান সাময়িকভাবে। সোশাল মিডিয়ার যুগে এই নাগরিক সমাজ অতিশয় বাঙ্ময়, বেপরোয়া, ক্ষেত্র বিশেষে অতি কর্কশ, নিন্দুক, সন্দেহ প্রবন এমনকী অবলীলায় চারটি অশ্লীল গালমন্দ করতেও এক পায়ে খাড়া। এরা রেয়াৎ করতে শেখেনি কেননা তারা স্বাধীন, কোনও দাদা-দিদির কাছে এদের টিকি বাঁধা নেই, অবাধ বাক-স্বাধীনতা প্রয়োগে অতি-মাত্রায় পটু। ফলে শ‍্যাম রাখতে গেলে এদের কূল হারাতেই হয়। ইতিহাস সরকারি-বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সদয় হয়নাএমন দৃষ্টান্ত আছে ভূরিভূরি।রাজসভা থেকে শেষ পর্যন্ত এরা নিক্ষিপ্ত হন আস্তাকুঁড়ে।

চলবে…

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles