সুমন চট্টোপাধ্যায়: একজন কবি কখন স্তাবক হয়ে ওঠেন?
প্রশ্নটা শুনতে যতটা সরল, উত্তরটা ততটাই জটিল। কারণ কোনও কবি এক সকালে উঠে সিদ্ধান্ত নেন না আজ থেকে আমি ক্ষমতার মুখপাত্র হব। এই রূপান্তর কখনওই এত নাটকীয় নয়। এটি ধীরে ধীরে ঘটে, প্রায় অদৃশ্যভাবে। এমনভাবে ঘটে যে অনেক সময় কবি নিজেও বুঝতে পারেন না, তিনি ঠিক কোন মুহূর্তে তার অবস্থান বদলে ফেললেন।
এই পরিবর্তনের গল্প আসলে একটি দীর্ঘ অভ্যস্ত হওয়ার গল্প—একটি সম্পর্কের গল্প যেখানে ক্ষমতা এবং সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একে অপরকে চিনে নেয়, গ্রহণ করে, এবং শেষ পর্যন্ত এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতায় পৌঁছে যায়।
প্রথমে আসে দূরত্ব।
একজন কবি তার নিজের জগতে থাকেন—লেখেন, পড়েন, বিতর্ক করেন, নিজের মতো করে ভাবেন। ক্ষমতা তার কাছে এমনএকটি বিষয় যাসমালোচনার, বিশ্লেষণের, কখনও কখনও বিরোধিতার। এই দূরত্বই তাকে স্বাধীনতা দেয়। এই দূরত্বের কারণেই তার ভাষা তীক্ষ্ণ হয়, তার প্রশ্ন অস্বস্তিকর হয়।
তারপর আসে সংযোগ।
কোনও এক সময়, কোনও একটি আমন্ত্রণ আসে—একটি সাহিত্য উৎসব, একটি সরকারি অনুষ্ঠান, একটি পুরস্কার বিতরণী। সেখানে কবি উপস্থিত হন, বক্তব্য রাখেন, অন্যদের সঙ্গে মিশে যান। এই সংযোগ প্রথমে নির্দোষ, মৌখিক সাংস্কৃতিক বিনিময় ছাড়া কিছুই নয়। এতে কোনও আপত্তির কারণ নেই।
বরং, অনেক সময় এটি প্রয়োজনীয়ও। কারণ রাষ্ট্র যদি সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তাহলেও সমস্যা; আবার যদি রাষ্ট্র সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যায়, তাহলেও সমস্যা। সঠিক ভারসাম্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয়, যখন এই সংযোগ নিয়মিত হয়ে ওঠে।
একটি আমন্ত্রণ থেকে দুটি, দুটি থেকে দশটি। একটি পুরস্কার থেকে আরও কিছু স্বীকৃতি। ধীরে ধীরে কবি বুঝতে পারেন, তিনি এখন একটি বৃহত্তর পরিসরের অংশ, একটি “দৃশ্যমানতা”-র অংশ।
এই দৃশ্যমানতা আসক্তির মতো।
কারণ একজন সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে এই “দেখা হওয়া” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চান, তার কাজ নিয়ে আলোচনা হোক, তার উপস্থিতি স্বীকৃত হোক। যখন ক্ষমতা সেই স্বীকৃতি দিতে শুরু করে, তখন একটি সূক্ষ্ম কৃতজ্ঞতা তৈরি হয়।
এই কৃতজ্ঞতাই প্রথম বাঁক।
কৃতজ্ঞতা নিজে কোনও সমস্যা নয়। কিন্তু যখন এই কৃতজ্ঞতা সমালোচনার জায়গাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন সেটি একটি সম্পর্ককে বদলে দেয়।
কবি তখন আর সম্পূর্ণ স্বাধীন নন। তিনি সচেতনভাবে না হোক, অবচেতনভাবে ভাবতে শুরু করেন, যারা আমাকে এত আদর করে, না চাইতেই বারেবারে সম্মানিত করে আমি কী তাদের সঙ্গে বেইমানি করব? করা উচিত?
এই প্রশ্নের কোনও সরাসরি উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্নটাই ধীরে ধীরে তার ভাষাকে বদলে দেয়।
এখানে দ্বিতীয় স্তরটি আসে। ক্ষমতার আলোয় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া।
কবি এখন নিয়মিতভাবে সেই পরিসরের অংশ। তিনি জানেন, কোন ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য, কোন ধরনের ভাষা প্রশংসিত হয়, কোন ধরনের অবস্থান তাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। এই উপলব্ধি তাকে একটি নিরাপদ পথ দেখায়। এই নিরাপদ পথেই তিনি হাঁটতে শুরু করেন।
প্রথমে হয়তো সামান্য, একটি মন্তব্যে একটু সংযম, একটি প্রশ্নে একটু দ্বিধা। তারপর ধীরে ধীরে এই সংযমই হয়ে ওঠে অভ্যাস। তিনি বুঝতে পারেন, কিছু বিষয় না বলাই ভালো বা কিছু বিষয়কে অন্যভাবে বলা ভালো।
এই “অন্যভাবে বলা”-টাই আসলে পরিবর্তনের মূল।
কারণ এখানে সরাসরি কোনও অবস্থান বদলানো হচ্ছে না বরং ভাষার ভেতরে একটি সূক্ষ্ম রূপান্তর ঘটছে। শব্দ একই থাকছে, কিন্তু তার তীক্ষ্ণতা কমে যাচ্ছে। প্রশ্ন একই থাকছে, কিন্তু তার ধার ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় কবি নিজেকে বোঝাতে পারেন, আমি তো কিছু ভুল করছি না। আমি তো এখনও লিখছি, এখনও ভাবছি, এখনও সমাজ নিয়ে কথা বলছি।
কিন্তু সেই কথার ভিতর থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে সেই অংশটি, যা ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারত।
এরপর আসে তৃতীয় স্তর—সমর্থন।
এই পর্যায়ে কবি আর শুধু সংযমী নন; তিনি সক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভকে সমর্থন করতে শুরু করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যুক্তি দেন, কখনও কখনও আক্রমণও করেন,কিন্তু সেই আক্রমণ সবসময় একটি নির্দিষ্ট দিকেই যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে—কবি আর “বাইরের” নন; তিনি তখন “ভিতরের”।
এই ভিতরের অবস্থান তাকে নতুন ভাবে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তিনি মনে করতে শুরু করেন, তিনি বাস্তবতাকে আরও ভালোভাবে বুঝছেন, তিনি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট জানেন, তিনি “ঠিক” জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।এই আত্মবিশ্বাসই তাকে তার প্রত্যয়ে আরও দৃঢ় করে তোলে।
এবং এখানেই স্তাবকের জন্ম সম্পূর্ণ হয়।
কিন্তু এই জন্ম কোনও হঠাৎ ঘটনা নয় ,এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল। এই প্রক্রিয়ায় কোনও একক মুহূর্ত নেই, যেখানে বলা যায়, এইখানেই তিনি বদলে গেলেন। বরং এটি অসংখ্য ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সমষ্টি, যেগুলি আলাদা করে দেখলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, কিন্তু একসঙ্গে মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ পরিবর্তন তৈরি করে।
এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য আমাদের আর একটি বিষয় বুঝতে হবে —সমাজের প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ একজন কবি যখন এই পথে হাঁটতে শুরু করেন, তখন সমাজ তাকে কীভাবে দেখে?
প্রথমে হয়তো কিছু প্রশ্ন ওঠে, কিছু সমালোচনা হয়। কিন্তু যদি সেই কবি যথেষ্ট জনপ্রিয় হন, যদি তার চারপাশে একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী থাকে, তাহলে সেই সমালোচনাগুলি ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। বরং একটি নতুন ন্যারেটিভ তৈরি হয়—তিনি সাহসী, তিনি প্রগতিশীল, তিনি সঠিকের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।
এই সামাজিক স্বীকৃতি কবিকে আরও দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ করে তোলে।
কারণ এখন তিনি শুধু ক্ষমতার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না; তিনি সমাজের একটি অংশ থেকেও সমর্থন পাচ্ছেন। ফলে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত স্বীকৃতি—ক্ষমতা এবং সমাজ—একজন কবিকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে তিনি নিজেকে প্রায় অপরিহার্য মনে করতে শুরু করেন।
তিনি ভাবেন, তার কণ্ঠস্বরই আসল, তার অবস্থানই সঠিক।
আর এখান থেকেই পচনের সূত্রপাত । কবি ধীরে ধীরে আত্মসমালোচনা করতে ভুলেই যান। যখন একজন কবি নিজেকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেন, তখন তার ভাষাও প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। তখন তার কবিতা আর অনুসন্ধান করে না বরং ঘোষণা করে।
এই ঘোষণামূলক কবিতাই আসলে স্তাবকের চিহ্ন। এটি সরাসরি স্লোগান নয়, কিন্তু তার খুব কাছাকাছি। এটি আবেগ দিয়ে মোড়া, কিন্তু তার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট।
এই অবস্থায় কবিতা তার স্বাধীনতা হারায়।
এবং যখন কবিতা তার স্বাধীনতা হারায়, তখন সমাজও একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়না হারায়।
কারণ কবিতা কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এটি একটি প্রতিফলন। এটি আমাদের দেখায়, আমরা কী ভাবছি, কী অনুভব করছি, কী প্রশ্ন করছি।
যখন সেই প্রতিফলন বিকৃত হয়—যখন তা একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভের সঙ্গে মিলে যায়—তখন সমাজ নিজেরই একটি আংশিক ছবি দেখতে পায়। এই আংশিকতাই আমাদের সঙ্কট।কারণ আমরা তখন ভাবি, এটাই সম্পূর্ণ সত্য।