Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের সঙ্গে শান্তি স্থাপনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘১৫ দফা কাঠামো পরিকল্পনা’ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কূটনীতিকদের মতে, ট্রাম্প যে পরিকল্পনার কথা বলছেন, তা আদতে তাঁর আলোচক দলের প্রায় এক বছর আগের একটি পুরনো প্রস্তাব।
২০২৫ সালের মে মাসের শেষদিকে এই ১৫ দফা পরিকল্পনাটিই আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু সেই সময় ইজরায়েল ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রের ওপর বিমান হামলা চালানোয় পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যায়। প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি পুরনো সেই ব্যর্থ প্রস্তাবই পুনরায় পেশ করছেন, না কি এবারের পরিকল্পনায় নতুন কোনো চমক রয়েছে?
ব্যর্থ পরিকল্পনার নতুন সংস্করণ?
কূটনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, যদি এই পরিকল্পনা এক বছর আগের সেই প্রস্তাবেরই পুনরাবৃত্তি হয়—যা ইরান একবার প্রত্যাখ্যান করেছে—তবে বুঝতে হবে আমেরিকা এই সপ্তাহের সম্ভাব্য আলোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেকের ধারণা, ট্রাম্প হয়তো বাস্তবে যতটা অগ্রগতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কিছু তুলে ধরে একটি কৃত্রিম সফল চিত্র তৈরি করতে চাইছেন।
ইরানের পাল্টা অভিযোগ
ইরান দাবি করেছে, মার্কিন বাজার চাঙ্গা রাখা এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখার কৌশল হিসেবেই ট্রাম্প এমন দাবি করছেন। বিশেষ করে সোমবার রাতে ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলার যে হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, তা কার্যকর না করার সাফাই হিসেবেই এই ‘১৫ দফা’র কথা বলা হচ্ছে। ট্রাম্প এই হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রেখে দাবি করেছেন যে, গত দু’দিনে “খুব ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনা হয়েছে। যদিও ইরান সরাসরি বা গোপন কোনো আলোচনার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের মতে, কেবল ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কিছু পরোক্ষ যোগাযোগ হয়েছে মাত্র।
কী ছিল সেই ১৫ দফা পরিকল্পনায়?
২০২৫ সালের সেই প্রস্তাবটি ছিল মূলত আমেরিকার একতরফা কিছু শর্তের সমষ্টি, যা মেনে নেওয়া ইরানের জন্য কঠিন ছিল। সেই পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো ছিল:
-
আর্থিক নিয়ন্ত্রণ: নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে প্রাপ্ত অর্থ ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহার করতে পারবে না।
-
ইউরেনিয়াম মজুত: ইরানকে তার সমস্ত ইউরেনিয়াম মজুত দেশ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে এবং সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
-
কেন্দ্র নিষ্ক্রিয়করণ: এক মাসের মধ্যে সমস্ত সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ও সেন্ট্রিফিউজ অকার্যকর করতে হবে।
-
বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি: এর বদলে আমেরিকা ইরানকে একটি অসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সাহায্য করবে, যার জ্বালানি ভাণ্ডার থাকবে ইরানের বাইরে এবং তা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকবে।
-
আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম: ইরান, আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সৌদি আরবকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সমৃদ্ধকরণ গোষ্ঠী গঠনের প্রস্তাবও সেখানে ছিল।
২০২৬-এর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট
২০২৫-এর অনেক শর্তই এখন অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কারণ ২০২৬ সালে আরও তিন দফা আলোচনার পাশাপাশি আমেরিকার সাম্প্রতিক বোমা হামলায় ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে ইরান এখন যে কোনো চুক্তির আগে আমেরিকার পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আর সামরিক হামলা না চালানোর শক্ত গ্যারান্টি চাইবে।
কূটনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু ইসলামাবাদ?
সম্ভাব্য এই আলোচনা পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে ইসলামাবাদে হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইতিপূর্বেই আলোচনার প্রস্তাব নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে যে, আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন। যুদ্ধ নিয়ে সংশয়ী হিসেবে পরিচিত ভ্যান্সের উপস্থিতি ইরানের কাছে ইতিবাচক বার্তা হতে পারে।
জি৭-এ মতভেদ
এদিকে ইরানের ওপর হামলা চালানো নিয়ে আমেরিকা এবং জি৭-এর বাকি দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ স্পষ্ট। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং জাপান সাফ জানিয়েছে, তারা এই যুদ্ধকে সমর্থন করে না। তাদের মতে, এই সামরিক হস্তক্ষেপ অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয়। প্যারিসে জি৭-এর বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই বিরোধের মুখে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন প্রস্তাব নিয়ে ধোঁয়াশা
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কিছু কূটনীতিকের মতে, আমেরিকার তরফে সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রস্তাব এখনো তৈরিই হয়নি। এমনকি যদি পর্দার আড়ালে কোনো পরিকল্পনা তৈরি হয়েও থাকে, সেটি এখনো ইরানের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি; ফলে তেহরানের সম্মতি পাওয়ার প্রশ্নটি এখনো অনেক দূরের বিষয়।
পরিশেষে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই আলোচনা এক অত্যন্ত জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িৎ সাফল্যের চেষ্টা, অন্যদিকে ইজরায়েলের আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং জি৭ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। পাকিস্তান যদি সত্যিই এই আলোচনার মূল মঞ্চ হয়ে ওঠে, তবে সেখানেও আমেরিকাকে এমন কিছু নিশ্চিত করতে হবে যা তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং সামরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আপাতত পুরো বিশ্বের নজর এখন প্যারিসের জি৭ বৈঠক এবং ইসলামাবাদের সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে।