Home খবর ভোটের আগে মমতার মাস্টারস্ট্রোক

ভোটের আগে মমতার মাস্টারস্ট্রোক

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রশাসনিক রদবদল নতুন নয়, তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একযোগে ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক হিসেব, আইনি সতর্কতা এবং নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার রণকৌশল।

কোন কোন পদ ছাড়লেন মুখ্যমন্ত্রী?

যে ২৩টি পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরে দাঁড়িয়েছেন, সেগুলো নিছক অলঙ্কারিক নয়। স্বাস্থ্য থেকে বন, শিল্প থেকে সংখ্যালঘু উন্নয়ন—প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের নীতি নির্ধারণী বোর্ড ও উপদেষ্টা পরিষদের শীর্ষে ছিলেন তিনি।

  • স্টেট হেলথ মিশনওয়াইল্ডলাইফ বোর্ড

  • অ্যাফরেস্টেশন ফান্ডইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনভেস্টমেন্ট প্রোমোশন বোর্ড

এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সরকার শুধু নীতি তৈরি করে না, বরং অর্থ বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদনের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। অর্থাৎ, সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরেও এই পদগুলোর মাধ্যমে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি কর্তৃত্ব বিস্তৃত ছিল।

নেপথ্যে কি ‘অফিস অফ প্রফিট’ বিতর্ক?

হঠাৎ এই গণ-ইস্তফার কারণ হিসেবে উঠে আসছে ‘অফিস অফ প্রফিট’ বা লাভজনক পদের বিতর্ক। ভারতীয় সংবিধানে একজন জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে যিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তিনি এমন কোনো পদে থাকতে পারেন না যা থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকারি সুবিধা বা প্রশাসনিক ক্ষমতা ভোগ করা যায়। এতে ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। একজন প্রার্থী একইসঙ্গে বিচারক, খেলোয়াড় এবং রেফারি—এই তিন ভূমিকায় থাকতে পারেন না।

নির্বাচন কমিশনের নজরদারি ও আইনি কবজ

রাজ্যে নির্বাচন দোরগোড়ায়। এই সময়ে নির্বাচন কমিশন প্রতিটি পদক্ষেপ কড়া নজরে রাখছে। বিরোধীরা যদি মুখ্যমন্ত্রীর এই পদগুলো নিয়ে ‘লাভজনক পদের’ অভিযোগ তুলে আইনি চ্যালেঞ্জ জানায়, তবে তাঁর প্রার্থিতা পর্যন্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঝুঁকিটা খুব ভালো করেই বোঝেন। তাঁর রাজনীতি বরাবরই রাস্তার, কিন্তু তাঁর কৌশল সবসময়ই অত্যন্ত সচেতন এবং হিসেবি। তাই নির্বাচন ঘোষণার পরপরই তিনি এক ঝটকায় ২৩টি পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন। এটা আত্মসমর্পণ নয়, বরং প্রতিরোধ—আগাম প্রতিরোধ। তাই বিরোধীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার আগেই তিনি অত্যন্ত হিসেবি চালে নিজেকে আইনি সুরক্ষা বলয়ে নিয়ে এলেন।

প্রভাব কমানো না কি আক্রমণের পথ বন্ধ?

এখানে আরও একটা দিক আছে। এই পদগুলোতে থেকে গেলে প্রশাসনের ওপর তাঁর প্রভাব যেমন থাকত, তেমনই সেই প্রভাবকে “অতিরিক্ত ক্ষমতা” বলে ব্যাখ্যা করা যেত। নির্বাচনের সময় এই ধরনের অভিযোগ খুব দ্রুত জনমত প্রভাবিত করতে পারে। তাই তিনি নিজের ক্ষমতার পরিধি খানিকটা কেটে ছেঁটে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এলেন, যেখান থেকে তাঁকে আক্রমণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।

ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা না কি ক্ষমতার সুরক্ষা?

এই ইস্তফাকে প্রশাসনিক ক্ষমতা সংকোচন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও নিশ্ছিদ্র করার কৌশল। কাগজে-কলমে পদ ত্যাগ করলেও সরকার ও প্রশাসন তাঁর নিয়ন্ত্রণেই থাকছে। অতীতেও সংকটের সময় এমন পদত্যাগের নজির রয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কৌশল।

উপসংহার

রাজনীতির ময়দানে সবসময় লড়াইটা জনসভায় হয় না; অনেক সময় তা হয় ফাইলের ভাঁজে আর আইনের ধারায়। ২৩টি পদ ছেড়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে ঠিক কখন এবং কতটা ছেড়ে দিতে হয়। নিজের ক্ষমতার পরিধি কিছুটা ছেঁটে ফেলে তিনি আসলে নিজেকে আরও দুর্ভেদ্য করে তুললেন, যেখানে বিরোধীদের আইনি আক্রমণের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেল।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles