Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: মনোরম আবহাওয়া আর স্টার্টআপের রমরমা—বেঙ্গালুরু বললেই এই ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই দুটি বৈশিষ্ট্যের বাইরে অন্য বড় ভারতীয় শহরগুলোর তুলনায় শহরটি তেমন কোনো বাড়তি সুবিধায় এগিয়ে নেই — খাবারে দিল্লি সমতুল্য, নাইটলাইফে মুম্বই কম যায় না, উল্টোদিকে রয়েছে দমবন্ধ করা যানজট আর নীরস স্থাপত্য। তবু একটি ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু নিঃশব্দে সবাইকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে — সেটি হলো শহরের শীর্ষ ধনীদের সামাজিক বিনিয়োগের প্রকৃতি ও মাত্রা। কেবল অর্থ সাহায্য নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে তাঁদের উদ্ভাবনী অংশগ্রহণ বেঙ্গালুরুকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ঐতিহ্যের নবজন্ম
ভারতের ইতিহাসে দানশীলতার ধারাটি নতুন নয়। স্বাধীনতার আগে রাজন্যবর্গ থেকে শুরু করে টাটা বা বিড়লার মতো শিল্পগোষ্ঠীগুলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিপুল অবদান রেখেছে। স্বাধীনতার আগে শত শত মহারাজা প্রজাদের জন্য স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী যুগে বোম্বে ও কলকাতার ব্যবসায়ীরা সম্পদ অর্জন করে জাদুঘর, স্থাপত্য ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে বিনিয়োগ করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর রিলায়েন্সের মতো কর্পোরেট জায়ান্টরা সেই ধারা বজায় রেখেছে। তবে বেঙ্গালুরুর প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা এই সংজ্ঞায় যোগ করেছেন এক নতুন মাত্রা। প্রথাগত দানশীলতা যেখানে স্কুল বা হাসপাতাল তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বেঙ্গালুরুর নতুন প্রজন্মের দাতারা সেখানে গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ’ এবং ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা’ বৃদ্ধির ওপর।
নিলেকানি থেকে কামাথ: বদলে যাওয়া মানচিত্র
ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যক্তিগত দাতা হিসেবে পরিচিত ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি এবং তাঁর স্ত্রী রোহিণী নিলেকানি এই আন্দোলনের অগ্রভাগে রয়েছেন। নিলেকানি কেবল অর্থ দেননি, আধার প্রকল্পের স্থপতি হিসেবে তিনি ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামো বা ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’-এর পেছনে নিজের মেধা ও সময় ব্যয় করেছেন।
একই পথে হাঁটছেন অন্যরাও:
-
ক্রিস গোপালকৃষ্ণন: মস্তিষ্ক-গবেষণাগার বা ব্রেইন রিসার্চের মতো জটিল বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।
-
কিরণ মজুমদার-শ ও রোহিণী নিলেকানি: তরুণদের বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রতি আগ্রহী করতে গড়ে তুলেছেন ‘সায়েন্স গ্যালারি’।
-
ভি. রবিচন্দর: কোটিপতি হয়েও তিনি ব্যক্তিগত সময় ব্যয় করছেন শহরের প্রশাসনিক নকশা ও নাগরিক পরিষেবা উন্নত করার কাজে।
এই অগ্রজদের দেখানো পথে এখন হাঁটছেন নিখিল ও নিথিন কামাথের মতো তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা। নগর-শাসনব্যবস্থার মতো আপাত জটিল বিষয়েও অর্থ ব্যয় করছেন তাঁরা।
কেন আলাদা বেঙ্গালুরুর ধনকুবেররা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি প্রধান কারণ।
প্রথমত, মুম্বই বা দিল্লির অনেক ধনকুবের পারিবারিক সূত্রে সম্পদ পেলেও বেঙ্গালুরুর প্রযুক্তিবিদরা মূলত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা। তাঁরা বাসে-ট্রেনে চড়ে বড় হয়েছেন, তাই সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো তাঁদের অভিজ্ঞতায় পরিষ্কার।
দ্বিতীয়ত, এঁদের অধিকাংশই প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ার। ফলে কেবল টাকা বিলিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাঁরা সমস্যার মূলে গিয়ে তার ‘টেকনিক্যাল’ সমাধান খুঁজতে পছন্দ করেন।
তৃতীয়ত, অন্য বড় শহরে যেখানে বহু প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই গড়ে উঠেছে, বেঙ্গালুরু সেখানে অল্প কিছুদিন আগেও ছিল এক শান্ত অবসরযাপনের শহর। এক সময়কার নিস্তব্ধ অবসরযাপনের শহর বেঙ্গালুরু আজ ঠিক একশো বছর আগের মুম্বইয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন টাটা পরিবার যেভাবে আধুনিক ভারতের জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল, আজকের বেঙ্গালুরুও ঠিক তাই করছে।
দেশি মেধা ও পুঁজিই এখন ভরসা
বর্তমানে বিদেশি অনুদানের ওপর কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ভেতর থেকেই অর্থ ও মেধার জোগান আসা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর সেই সংকটকালেই বেঙ্গালুরুর এই ‘প্রতিষ্ঠান-নির্মাণমুখী’ দানশীলতা ভারতের ভবিষ্যতের দিশারি হয়ে উঠছে।