Home দৃষ্টিভঙ্গি জ্বালানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স – তিন ফ্রন্টে চাপে ভারত

জ্বালানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স – তিন ফ্রন্টে চাপে ভারত

0 comments 3 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ভারতের অর্থনীতির চিত্রটি ছিল উজ্জ্বল। বিশ্বের দ্রুততম-বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির একটি হিসেবে ভারত নিয়মিতভাবে প্রতিবেশী চীনকেও পিছনে ফেলে এগিয়ে চলছিল। ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে দেশটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির আসনে পৌঁছে গিয়েছিল, আর চতুর্থ স্থানে থাকা জাপানকে ছাপিয়ে যাওয়াও ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা। ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-নীতিজনিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের দক্ষ শ্রমশক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা ও শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার দেশটিকে বিনিয়োগকারীদের কাছে এক ‘নিরাপদ বাজি’ করে তুলেছিল।

কিন্তু সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মার্কিন-ইজরায়েলি-ইরান সংঘাত ভারতের অর্থনীতির জন্য এক নিখুঁত ঝড়ের পরিবেশ তৈরি করেছে এবং যে শক্তি এত দিন ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সেই পারস্য উপসাগরের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কই এখন পরিণত হচ্ছে দুর্বলতায়।

জ্বালানি সংকট: সবচেয়ে তাৎক্ষণিক আঘাত

ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং গ্যাসের ৮০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের পর থেকে দেশটি ব্যাপকভাবে নির্ভর করে আসছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেলের উপর — ইরানের দক্ষিণ উপকূলের এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহিত হয়। ভারত তার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে।

জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে গোটা অর্থনীতিতে। হুমকির মুখে পড়ছে ভারতের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতির ভারসাম্য। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঘরে ঘরে ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাসের সংকট অনুভূত হচ্ছে। সরকার জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, দীর্ঘ মেয়াদে শুল্ক কমানো বা ভর্তুকি বাড়ানো হলে আর্থিক ঘাটতির চাপ তীব্র হবে।

সরবরাহ নিশ্চিতে সরকারের পদক্ষেপ

এপ্রিলের রাজ্য নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অধিকাংশ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবেন বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে সরকার ইতিমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। আমেরিকার অনুমতি নিয়ে নিষেধাজ্ঞায় আটকে পড়া রুশ তেল কেনা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া দুটি গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারের নিরাপদ যাতায়াতও নিশ্চিত করা হয়েছে।

রপ্তানি ও বাণিজ্য: ঝুঁকির মুখে বাজার

যুদ্ধ শুরুর মাত্র চার দিন আগে ভারত সরকার উপসাগরীয় আরব দেশগুলিকে ‘সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার গোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ভারত এই অঞ্চলে ইলেকট্রনিক্স, বস্ত্র, রত্নপাথর, বাসমতি চাল এবং পরিশোধিত জ্বালানিসহ নানা পণ্য রপ্তানি করে।

অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক তালমিজ আহমেদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারত যে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, তার অর্ধেকই সেখান থেকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও আফ্রিকায় পুনরায় পাঠানো হয়। বিমানপথ, সমুদ্রপথ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে এই বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে কারণ বহু ভারতীয় সংস্থা দুবাইকে তাদের পণ্য বিশ্বজুড়ে পাঠানোর কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।

প্রবাসী আয়: চাপে পড়তে পারে ১৩০ বিলিয়ন ডলারের খাত

ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) গ্রহণকারী দেশ। গত বছর মোট প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট তেল আমদানির ব্যয়ের প্রায় সমান। এর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যেখানে পারস্য উপসাগরের ছয়টি দেশের তীরবর্তী অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় বসবাস করেন।

বিদেশে কর্মরত এই ভারতীয়রা তাদের আয়ের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পরিবারের কাছে পাঠান। তাদের আয়ে ধাক্কা লাগলে তা দেশের ইতিমধ্যেই চাপে থাকা মুদ্রাকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।

আহমেদ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের অর্থনীতি এতটাই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত যে “উপসাগরের প্রতিটি প্রকল্পেই ভারতের ছাপ রয়েছে।”

সংকটের মাঝে একজন শ্রমিকের গল্প

কাতারে নির্মাণকাজে নিযুক্ত এক ভারতীয় শ্রমিক জানিয়েছেন, তিনি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং কাছের শ্রমিক শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে আগুন লাগার ঘটনাও তাঁর জানা। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উত্তরপ্রদেশে থাকা পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে — প্রায় ১,৮০০ মাইল দূরে।

তিনি বলেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা চান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক, যাতে কাজ আবার শুরু হতে পারে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শ্রমিক জানান, দেশে ফেরার কথা মাথায় এলেও ভয় হচ্ছে। ফিরে গেলে হয়তো নিয়োগকর্তা আর কখনো কাজে নেবেন না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগে বিদেশি শ্রমিকদের গ্রেফতার করছে বলেও তিনি জানান।

গোল্ডম্যান স্যাক্সের সতর্কতা ও বাজারের পতন

গত সপ্তাহে গোল্ডম্যান স্যাক্স সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী বছর ভারতের সামনে একসঙ্গে তিনটি ঝুঁকি এসে দাঁড়িয়েছে — ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং দুর্বল মুদ্রা। এর পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি মূল্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও প্রতিবেশী দেশগুলিতে রপ্তানি হ্রাস এবং সম্ভাব্য প্রবাসী আয় কমে যাওয়া। বিনিয়োগ সংস্থাটি বলেছে, ভারতের ‘ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির গল্প’ এখন এক ‘নতুন আঘাত’-এর মুখে পড়েছে। গত এক মাসে দেশের শেয়ার বাজার প্রায় ১০ শতাংশ নেমে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকিং গোষ্ঠী এএনজেড এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারতের অর্থনীতি এখনও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট সামলানোর সক্ষমতা এবার পরীক্ষার মুখে পড়বে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল সংস্থা, সরকার বা সাধারণ ভোক্তা, কেউই দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর মতো আর্থিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারেনি।

হায়দরাবাদের গিটাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ রথীন রায় মনে করেন, উপসাগরীয় সংকট ভারতের পরিশোধ ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) উপর সতর্ক নজর রাখার প্রয়োজন তৈরি করবে। আমদানি যখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, তখন একই সঙ্গে রপ্তানিও ব্যাহত হবে। তিনি জানান, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী থাকলেও এক বছরের মধ্যে তা অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

উল্লেখযোগ্য, ভারতের শীর্ষ শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি ২০২২ সালে দুবাইয়ের পাম জুমেইরায় ১৬৩ মিলিয়ন ডলারে একটি বিলাসবহুল ভিলা কিনে রেকর্ড গড়েছিলেন — যে এলাকা যুদ্ধের প্রথম দিনেই হামলার শিকার হয়েছে। এই একটি তথ্যই বলে দেয়, উপসাগর ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা গভীর এবং এই সংকট কতটা বহুমাত্রিক।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles