Table of Contents
পর্ব ১ | রাজপুত্র, কৌশলবিদ ও ধনকুবের—এপস্টাইনের নেটওয়ার্কে যাঁরা
জেফ্রি এপস্টাইনের গোপন নথিপত্র প্রকাশের পর তার অভিঘাত এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রকাশের পর ইতিমধ্যে অন্তত নয়জন প্রভাবশালী ব্যক্তি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, শুরু হয়েছে একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিতর্কিত সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর।
তথ্যের এই বন্যা এতটাই বিপুল যে কে কোথায় কতটা জড়িত—তার পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তবু দ্য গার্ডিয়ান-এর তথ্যবিশ্লেষণ এক জটিল কিন্তু স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে: এপস্টাইনের সঙ্গে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ, দীর্ঘস্থায়ী এবং নিয়মিত যোগাযোগের উপর প্রতিষ্ঠিত।
এই অনুসন্ধানে এক মিলিয়নেরও বেশি ইমেল পর্যালোচনা করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত দেড় লক্ষের বেশি পৃথক ইমেল চিহ্নিত হয়েছে—যেগুলি এপস্টাইন এবং বিভিন্ন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি, তাঁদের সহকারী বা ঘনিষ্ঠদের মধ্যে আদান-প্রদান হয়েছে। দুই পর্বের এই অনুসন্ধানী ধারাবাহিকে ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টাইনের যোগাযোগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সাতজন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির ডিজিটাল সম্পর্কের মানচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এই প্রথম পর্বে আলোচনায় রয়েছেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর, পিটার ম্যান্ডেলসন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাক্তন প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন এবং আমিরাতের ধনকুবের সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম। দ্বিতীয় পর্বে থাকবেন চলচ্চিত্র পরিচালক উডি অ্যালেন, বার্কলেজের প্রাক্তন প্রধান জেস স্ট্যালি এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও মার্কিন অর্থমন্ত্রী ল্যারি সামার্স।
গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি: এই নথিতে কারও নাম থাকা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক প্রমাণ নয়।
স্টিভ ব্যানন: ‘Brother Epstein’-এর সঙ্গে রাজনীতি, চলচ্চিত্র ও বিতর্কিত কথোপকথন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাক্তন প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে এপস্টাইনের যোগাযোগ প্রধানত হোয়াটসঅ্যাপে হলেও, প্রায় দেড় হাজার ইমেল চিহ্নিত হয়েছে—মূলত ২০১৮ সালে, যখন ব্যানন হোয়াইট হাউস ছেড়ে দিয়েছেন। এই কথোপকথনে রাজনীতির পাশাপাশি সিনেমা ও প্রচার কৌশল নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
২০১৮ সালের মে মাসে ব্যানন এপস্টাইনকে একটি গার্ডিয়ান নিবন্ধ পাঠান, যেখানে ডাচ একটি প্রদর্শনীতে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারণার বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল। সেই নিবন্ধে নাৎসি চলচ্চিত্র নির্মাতা লেনি রিফেনস্টালের প্রসঙ্গ টেনে ব্যানন তাঁকে নিজের “নায়ক” বলে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি কেবল রিফেনস্টালের প্রযুক্তিগত কৌশল থেকে শিখেছেন, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে নয়।
একটি ইমেলে এপস্টাইন রসিকতার ছলে লিখেছিলেন—তাঁরা একসঙ্গে সেই প্রদর্শনী দেখতে যেতে পারেন, যেখানে একজন অ্যাডলফ হিটলারের এবং অন্যজন লেনির পোশাক পরবেন। এর জবাবে ব্যাননের সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল—”Leni my hero।”
রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যাননের ইউরোপে ডানপন্থী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ার পরিকল্পনাও উঠে আসে। এপস্টাইন তাঁকে পরামর্শ দেন—দূর থেকে রাজনীতি চালানো যায় না, ব্যক্তিগত যোগাযোগই আসল শক্তি।
শুধু রাজনৈতিক পরামর্শদাতাই নন, এপস্টাইন ব্যাননের মিডিয়া প্রকল্পেরও অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন। ব্যানন তাঁর তথ্যচিত্র American Dharma এবং ট্রাম্প-ভিত্তিক আরেকটি সিনেমা Trump @War-এর প্রাথমিক সংস্করণ দেখে মতামত দেওয়ার জন্য এপস্টাইনকে অনুরোধ করেছিলেন।
এপস্টাইন ব্যাননকে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন—যাঁদের মধ্যে ছিলেন কেনেথ স্টার, ব্যবসায়ী টম প্রিটজকার, দার্শনিক নোয়াম চমস্কি এবং সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম।
ব্যাননের বিরুদ্ধে এপস্টাইন-সংক্রান্ত কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ নেই। তিনি নিজেও দাবি করেছেন, তাঁদের সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ পেশাগত।
সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম: বন্ধুত্ব, ব্যবসা ও অন্ধকারের ইঙ্গিত
দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ডের (DP World) প্রধান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম এবং এপস্টাইনের মধ্যে ইমেল যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত—২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪,২০০ সরাসরি ইমেল। এই দীর্ঘ যোগাযোগে একদিকে যেমন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, ভ্রমণসূচি ও সংবাদপত্রের লিঙ্ক বিনিময় হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত ও কখনও কখনও আপত্তিকর আলাপচারিতাও।
সম্পর্ক এমন পর্যায়ে ছিল যে একাধিক ইমেলে তাঁরা একে অপরকে সরাসরি “বন্ধু” বলে সম্বোধন করেছেন। কথোপকথনে নারীদের নিয়ে মন্তব্য এবং শারীরিক আকর্ষণ-সংক্রান্ত বর্ণনাও রয়েছে যা এই সম্পর্কের নৈতিক দিক নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
একটি ইমেলে সুলায়েম লিখেছেন—একজন ইউক্রেনীয় ও একজন মলদোভান নারী তাঁর কাছে এসেছেন; মলদোভানটি আহামরি নন, তবে ইউক্রেনীয়টি “অত্যন্ত সুন্দরী।” অন্য একটি ইমেলে এক তরুণীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বর্ণনা দেন সুলায়েম, যেখানে স্পষ্ট যৌন ইঙ্গিত রয়েছে।
২০০৯ সালের একটি ইমেলে এপস্টাইন লিখেছিলেন—”আমি ওই টর্চার ভিডিওটা খুব পছন্দ করেছি।” মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পরে ইঙ্গিত দেন, বার্তাটি সুলায়েম-সংযুক্ত একটি ইমেল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল। তবে এই বিষয়ে সুলায়েম বা তাঁর সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড এখনও কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য করেনি।
এই তথ্য প্রকাশের পরপরই সুলায়েম ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর প্রধান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধেও কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি।
অন্য একটি ইমেলে দেখা যায়, এপস্টাইন সুলায়েমকে প্রস্তাব দিচ্ছেন প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে আমন্ত্রণ জানাতে এবং সেই আয়োজন নিজে করে দেওয়ার কথাও বলছেন। একইসঙ্গে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা জয় ইতো-র সঙ্গে দুবাইয়ে সাক্ষাতের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ আছে।
প্রকাশিত এই নথিগুলি যেন এক জটিল নেটওয়ার্কের মানচিত্র—যেখানে ক্ষমতা, অর্থ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং নৈতিক প্রশ্ন একসূত্রে গেঁথে গেছে। সত্যের পূর্ণ রূপ এখনও উন্মোচিত হয়নি, কিন্তু এই টুকরো টুকরো যোগাযোগ এক গভীরতর বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলে দিচ্ছে—এমন এক জগতের, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ছায়ায় আড়াল হয়ে থাকে।
পরবর্তী পর্বে থাকবে উডি অ্যালেন, জেস স্ট্যালি ও ল্যারি সামার্সের সঙ্গে এপস্টাইনের সম্পর্কের বিশ্লেষণ।