Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতার মান ২০২৫ সালে টানা বিশতম বছরের মতো নিম্নগামী হয়েছে। মার্কিন গণতন্ত্র-পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফ্রিডম হাউসের বার্ষিক প্রতিবেদন ফ্রিডম ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড 2026 জানাচ্ছে, ৫৪টি দেশে স্বাধীনতার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যেখানে উন্নতি হয়েছে মাত্র ৩৫টি দেশে। সামরিক অভ্যুত্থান, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন এবং নির্বাহী ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ — এই তিনের সমন্বয়ে মৌলিক স্বাধীনতার পরিধি এক বিস্তৃত পরিসরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত দুই দশকে প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষিত ২৫টি সূচকের প্রায় সবকটিতেই পতন ঘটেছে। তবে সবচেয়ে তীব্র অবনমন হয়েছে তিনটি ক্ষেত্রে — সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার। ১০০ পয়েন্টের বৈশ্বিক স্কেলে গত ২০ বছরে এই তিনটি সূচকের গড় স্কোর যথাক্রমে ১৫ শতাংশ, ১৭ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ কমেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এই ক্ষয় অব্যাহত থাকলে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতা আরও দুর্বল হবে, গুরুত্বপূর্ণ নীতি নিয়ে জনপরিসরের বিতর্ক সংকুচিত হবে এবং স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়বে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় কোপ
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতারাও ক্রমশ সংবাদমাধ্যমের নজরদারি সহ্য করতে চাইছেন না। প্রক্রিয়াটি সাধারণত শুরু হয় কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমে। তারপর গড়ায় সরকারি তহবিল আটকে দেওয়া বা সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমের বিজ্ঞাপন আয় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দিকে। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে সরকারঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যম কিনে নিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়, অথবা সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়।
এই কৌশলগুলির প্রায় সবই প্রয়োগ হয়েছে হাঙ্গেরিতে। প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বান-এর নেতৃত্বাধীন ফিদেজ দল ক্ষমতায় টানা ১৬ বছর পূর্ণ করতে চলেছে। সমালোচনামূলক সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম ক্রমবর্ধমান আইনি হয়রানির শিকার হয়েছে এবং গত নভেম্বরে একটি সরকারপন্থী মিডিয়া সংস্থা দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যাবলয়েডটি অধিগ্রহণ করে। ২০১০ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ফিদেজ ধাপে ধাপে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করেছে — কঠোর আইন প্রণয়ন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম থেকে বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার এবং সরকারপন্থী মিডিয়ার বিস্তারের মাধ্যমে। এর ফলে গত ২০ বছরে ফ্রিডম হাউসের স্কেলে হাঙ্গেরির স্কোর ২৮ পয়েন্ট কমে গেছে।
ব্যক্তিগত মতপ্রকাশে কঠোর দমননীতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাগুলি সমালোচনামূলক বক্তব্য দমনে আরও নির্মম হয়ে উঠেছে। ব্যাপক গ্রেপ্তার ও মামলার মাধ্যমে তারা এমন একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে, যাতে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে মতামত দিতে নিরুৎসাহিত হয়।
ইরানের চিত্র এই প্রবণতার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ। ২০২৫ সালের শেষদিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের জবাবে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে, সাংবাদিকদের কারাবন্দি করে এবং রাস্তায় অসংখ্য বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে। মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে প্রায় ৭,০০০ হলেও বিভিন্ন অনুমানে তা ৩০,০০০-এরও বেশি হতে পারে।
দীর্ঘ চার দশক ধরে ফ্রিডম হাউসের তালিকায় “নট্ ফ্রী” হিসেবে চিহ্নিত এই রাষ্ট্র ক্রমশ ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং সমালোচকদের দমন করতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। সামাজিক মাধ্যমে সরকারবিরোধী পোস্টের অপরাধে বহু মানুষ দীর্ঘ কারাদণ্ড, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত পেয়েছে। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন রেভলিউশন’ থেকে শুরু করে ২০২২ সালের ‘উওম্যান লাইফ ফ্রিডম’ আন্দোলন — প্রতিটি গণআন্দোলনই সেন্সরশিপ, গ্রেপ্তার এবং প্রাণঘাতী দমননীতির মুখে পড়েছে।
ন্যায়বিচার এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার
অনেক দেশে শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ বিরোধিতা দমন করছে। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হংকং-এর।৭৮ বছর বয়সী গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া উদ্যোক্তা জিম্মি লাইকে ‘বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক প্রকাশনা’-র মতো অস্পষ্ট অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের অধীনে হংকং-এর আইনের শাসন ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপর ধারাবাহিক আঘাতের অংশ।২০২০ সালে বেইজিং কর্তৃক আরোপিত ন্যাশনাল সিকিউরিটি ল-তে এমন বহু বিধান রয়েছে যা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকে দুর্বল করে, যেমন গোপন বিচার ও মামলা মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তরের সুযোগ। এর ফলে নির্বিচার গ্রেপ্তার ও কারাবাস বেড়েছে এবং বহু ভিন্নমতাবলম্বী দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি এক প্রবাসী গণতন্ত্রপন্থী কর্মীর পিতাকে আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে যা এই আইনের প্রথম ‘পারিবারিক প্রয়োগ’-এর নজির বলে বিবেচিত হচ্ছে।
লড়াই এখনও বাকি
গত দুই দশকে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের মুখে পড়েছে। ফ্রিডম হাউস বলছে, এই পরিস্থিতি পাল্টাতে হলে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে শক্তিশালী করা, ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা — এই তিনটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তবে ঠিক এই মুহূর্তে গণতান্ত্রিক বিশ্ব উল্টো পথে হাঁটছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক গণতান্ত্রিক দেশ বৈশ্বিক স্বাধীনতার রক্ষাকর্তা হিসেবে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমিকা থেকে সরে এসেছে। ২০২৫ সালে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রপন্থী উদ্যোগগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং কর্মীদের সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে — ঠিক সেই সময়ে, যখন রাষ্ট্রের দমননীতি অব্যাহত রয়েছে।
সংস্থাটির সুপারিশ, গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে দমনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে এবং পক্ষপাতদুষ্ট সরকারি সমর্থনের নিন্দা জানাতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নতুন অর্থায়ন মডেল গড়ে তোলাও জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি। মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও এগিয়ে আসতে হবে — বিশেষ করে সেন্সরশিপ এড়ানো, নজরদারি থেকে সুরক্ষা এবং যোগাযোগের বাধা অতিক্রম করার প্রযুক্তি উন্নয়নে। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা জোরদার করা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকারদের পক্ষে লড়া আইনজীবীদের সহায়তাকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা যে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে, তার প্রমাণ রয়েছে। গত এক দশকে ফ্রিডম হাউসের জরুরি সহায়তা কর্মসূচি ১৭,০০০-এরও বেশি মানবাধিকার কর্মী ও সংস্থাকে সুরক্ষা দিয়েছে। তবে এই প্রচেষ্টা শুধু সীমিত সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভর করে টেকসই হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার, দাতব্য সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল সামনের সারিতে লড়াই করা মানুষ ও কর্মীদের কাছে কার্যকর সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব।
ফ্রিডম হাউসের বার্তা স্পষ্ট — স্বাধীনতার এই দীর্ঘ অবক্ষয় রুখতে হলে এখনই প্রয়োজন কার্যকর, সম্মিলিত এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ।