বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় প্রবেশ করেছে, জ্বালানি অবকাঠামোকে সরাসরি যুদ্ধের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। আর এই কৌশলের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে কাতারের রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্স — বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) উৎপাদন কেন্দ্র।
গত ৩ মার্চ ইরান প্রথমবার রাস লাফানে ড্রোন হামলা চালায়। হামলায় তাৎক্ষণিক গুরুতর ক্ষতি না হলেও, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাতার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই একটি কমপ্লেক্স থেকে।
পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয় ১৮ মার্চ, বুধবার। ইরান এবার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করে রাস লাফানে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কাতারএনার্জি জানায়, এবার হয়েছে “ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।”
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আঘাত হেনেছিল যা এই পাল্টা আক্রমণের সরাসরি প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ইরান আগেই যে জ্বালানি স্থাপনাগুলিকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, রাস লাফান তার মধ্যেই ছিল।
এতদিন পর্যন্ত ইরানের নিজস্ব জ্বালানি খাত তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপে হামলা চালালেও তা মূলত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাউথ পার্সে এই হামলাকে একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তাৎক্ষণিক ও তীব্র। ইউরোপের প্রধান সূচক ডাচ TTF প্রাকৃতিক গ্যাস ফিউচার বৃহস্পতিবার সকালে ২৮.০৬% বেড়ে পৌঁছেছে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৭০ ইউরোয় — বাজার খোলার সময় যা ৩৫% পর্যন্ত উঠেছিল। তেলের বাজারেও চাপ বাড়ছে।
এতদিন বিশেষজ্ঞদের প্রধান আশঙ্কা ছিল হরমুজ প্রণালী নিয়ে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিশাল একটি অংশের তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, এই পথে যেকোনো জাহাজ আক্রমণের শিকার হতে পারে যার ফলে কার্যত রপ্তানি প্রবাহ কমে যায় এবং উপসাগরীয় দেশগুলি উৎপাদন কমাতে, এমনকি বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
তবে এখন পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সরাসরি উৎপাদন কেন্দ্র, টার্মিনাল ও রিফাইনারি লক্ষ্য করে হামলা শুরু হয়েছে। তেহরান আঘাত হেনেছে একাধিক মার্কিন-মিত্র দেশের জ্বালানি স্থাপনায় — সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাহ গ্যাসক্ষেত্র ও ফুজাইরাহ তেল টার্মিনাল, সৌদি আরবের শাইবাহ ও বেরি তেলক্ষেত্র এবং ইরাকের মাজনুন ক্ষেত্র।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। ইরান থেকে তুরস্ক ও ইরাকে যে গ্যাস রপ্তানি হতো, তার বড় অংশ বন্ধ। বাগদাদ ঘোষণা করেছে, ইরানি গ্যাস সরবরাহ “সম্পূর্ণরূপে বন্ধ।” তুরস্ক এখন বিকল্প হিসেবে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে যা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াবে।
মার্কিন পরামর্শক সংস্থা উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক টম মারজেক-ম্যানসার সতর্ক করেছেন, “হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুললেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও অনেক সময় লাগতে পারে।” যদি বড়সড় কাঠামোগত ক্ষতি হয়, তাহলে যুদ্ধ থামলেও উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।
বুধবার রাতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ “জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা” বন্ধে একটি আন্তর্জাতিক মোরাটোরিয়ামের আহ্বান জানান। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা রক্ষায় এই পদক্ষেপ জরুরি।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি সাউথ পার্সে ইসরায়েলের হামলাকে আখ্যা দিয়েছেন “বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ” হিসেবে। তাঁর ভাষায়, “জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা মানে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সতর্ক করেছেন, এই ধরনের হামলার “অপ্রতিরোধ্য পরিণতি” হতে পারে, যা গোটা বিশ্বকে গ্রাস করতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, সাউথ পার্সে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে আগাম জানানো হয়েছিল ট্রাম্পকে এবং তিনি তা অনুমোদনও করেছিলেন — ইরানকে হরমুজ প্রণালী অবরোধ থেকে সতর্ক করার কৌশল হিসেবে। তবে পরে নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র “এই হামলার বিষয়ে কিছুই জানত না।”
তবে হুঁশিয়ারি দিতে তিনি পিছু হাঁটেননি। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরান যদি কাতারের মতো একটি “নির্দোষ দেশ”-এর ওপর “অবিবেচকের মতো” আঘাত হানে, তাহলে আমেরিকা, ইজরায়েলের সহায়তা থাকুক বা না থাকুক , এমন শক্তি প্রয়োগ করবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি, এবং সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।