Home খবর ইউরোপ কেন ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ালনা

ইউরোপ কেন ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ালনা

0 comments 1 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইউরোপ চায় ডোনাল্ড ট্রাম্প যত দ্রুত সম্ভব ইরানে চলা যুদ্ধের ইতি টানুন। কিন্তু যে একমাত্র বাস্তব চাপটি ট্রাম্পকে সেই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে, সেটি ব্যবহার করতে ইউরোপ নারাজ।

সেই চাপের বিন্দুটি হল হরমুজ প্রণালী — বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। ইরান কার্যত এই প্রণালীতে এক ধরনের অঘোষিত অবরোধ তৈরি করেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকাশছোঁয়া। ট্রাম্প ইউরোপকে আহ্বান জানিয়েছেন নৌবাহিনী ও সামরিক শক্তি পাঠিয়ে এই পথ নিরাপদ করতে সাহায্য করতে। কিন্তু ইউরোপীয় নেতারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন — প্রকাশ্যে এবং আড়ালে। তাদের আপত্তির কারণ মোটামুটি চারটি।

১. এই যুদ্ধ তাদের নয়

গত মাসের শেষদিকে আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ করা হয়নি, গঠন করা হয়নি কোনও আন্তর্জাতিক জোটও ; যেমনটা দুই দশক আগে ইরাক যুদ্ধের সময় জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন করেছিল।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইউরোপের কাছে কেবল সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলেন। জার্মানি দ্রুত রাজি হয়, ব্রিটেন সীমিতভাবে সম্মতি দেয়, কিন্তু স্পেন সরাসরি না বলে দেয়। পরে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের আক্রমণে তেলের দাম বাড়তে শুরু করলে ট্রাম্প আরও বড় সামরিক সহায়তা চান, তবে কোনও সুস্পষ্ট কৌশল, সময়সীমা বা আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ছাড়াই।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই যুদ্ধ শুরু করার আগে আমাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি। ইরান নিয়ে কোনও যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাই জার্মানি কীভাবে সামরিকভাবে অংশ নেবে, সেই প্রশ্নই ওঠে না।”

২. এটা NATO-র কাজ নয়

ট্রাম্প বারবার ন্যাটোর প্রসঙ্গ তুলে ইউরোপীয় দেশগুলিকে তাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, ন্যাটোকে এইভাবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই।

ন্যাটো মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্যরা সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এই ধারা ইতিহাসে মাত্র একবার কার্যকর হয়েছিল — ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ একটি পূর্ব-পরিকল্পিত আক্রমণ, যা ন্যাটোর প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর আওতায় পড়ে না।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “ন্যাটো নিজে এই সংঘাতে জড়িত নয়। সদস্য দেশগুলি কিছু সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু জোট হিসেবে অংশ নিচ্ছে না।”

৩. পরিকল্পনা কাজ নাও করতে পারে

হরমুজ প্রণালীতে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি ছোট ইরানি স্পিডবোটও একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম। মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই এই হুমকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলির প্রশ্ন — তাদের তুলনামূলক সীমিত নৌশক্তি পাঠিয়ে পরিস্থিতি আদৌ বদলাবে কিনা। সামরিক ঝুঁকি নিলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে তারা নিশ্চিত নয়।

৪. যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে

এই যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ পড়ছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। ইউরোপীয় নেতারা দ্রুত এই চাপ কমাতে চান।

তবে তাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হিসাব আছে। গোপনে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, ট্রাম্পকে কোনও সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করতে পারে মূলত দুটি বিষয় — আর্থিক বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং আমেরিকান ভোটারদের মনোভাব। হরমুজ প্রণালীর জটিলতা এই দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করছে। তেলের দাম বাড়লে ভোটার অসন্তোষ বাড়বে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।

এই চাপই ইউরোপের কাছে একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার। সামরিক সহায়তা দিয়ে সেই চাপ নষ্ট করতে তারা রাজি নয়।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অন্যত্র। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে একটি ভেঙে পড়া, অস্থির ইরান তৈরি হবে, যেখান থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে ইউরোপের দিকে পাড়ি দেবে। ইউরোপের কাছে তাই এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি একটি সম্ভাব্য মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।

সব মিলিয়ে ইউরোপ এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক খেলা খেলছে। সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ এড়িয়ে, অর্থনৈতিক চাপকে কাজে লাগিয়ে তারা ট্রাম্পকে যুদ্ধ শেষ করার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles