Home খবর লারিজানি থেকে খামেনেই – ইজরায়েলের হিটলিস্টে ইরানের শীর্ষ নেতারা

লারিজানি থেকে খামেনেই – ইজরায়েলের হিটলিস্টে ইরানের শীর্ষ নেতারা

0 comments 9 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: আলি লারিজানি নিহত। তার আগে খামেনেই, নাসরাল্লাহ, হামাসের নেতারা। ইসরায়েলের হিটলিস্ট যেন ফুরোচ্ছে না — বরং দীর্ঘ হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই মৃত্যুর মিছিল কি ইরানকে নতজানু করবে, নাকি আরও কট্টর শত্রু তৈরি করবে?

ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মঙ্গলবার গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করল — ইরানের কার্যত শাসক হিসেবে বিবেচিত আলি লারিজানিকে হত্যা তাদের গোয়েন্দা দক্ষতা ও সামরিক সক্ষমতার এক বড় সাফল্য। এর পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের লক্ষ্য করেও বিমান হামলা চালানো হয়। সব মিলিয়ে, আমেরিকা-ইজরায়েল যৌথ অভিযানের প্রথম দিনের পর এটিই ইরানের নেতৃত্বের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। সেই প্রথম দিনেই তেহরানের একটি কম্পাউন্ডে বিমান হামলায় নিহত হয়েছিলেন আয়াতোল্লা আলি খামেনেই এবং তার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা।

এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে — বিশেষত ইরানের সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল করে গণ-বিদ্রোহের পরিবেশ তৈরি করতে — ইসরায়েল কতটা নির্ভর করছে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের ওপর। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতেই এই নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছিল।

নেতানিয়াহু ও কাট্‌জের বার্তা

“আমরা যদি এই পথেই এগিয়ে যাই, তাহলে তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ করে দেব” — মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় ইজরায়েলিদের উদ্দেশে বলেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাট্‌জ আরও তীব্র ভাষায় জানিয়েছেন, তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের নেতাদের খুঁজে বের করে একের পর এক হত্যা চালিয়ে যেতে — “অক্টোপাসের মাথা বারবার কেটে ফেলতে হবে, যাতে তা আর বেড়ে উঠতে না পারে।”

কৌশলের সাফল্য নাকি সীমাবদ্ধতা?

লারিজানির মৃত্যু এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয় — ইজরায়েল কি এত বিপুল সংখ্যক ইরানি নেতাকে হত্যা করছে কারণ এটিই তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে নিশ্চিত উপায়? নাকি কেবল তারা তা করতে সক্ষম বলেই করছে?

শত্রু নিধনে ইজরায়েলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে ১২ জন ইজরায়েলি ক্রীড়াবিদ হত্যার পর দীর্ঘ প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানো হয়েছিল। ২০০০-এর দশকের শুরুতে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালে বৈরুতে হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে বিমান হামলায় হত্যা করা হয়; কয়েক দিনের মধ্যেই তার উত্তরসূরিও একই পরিণতি ভোগ করেন।

তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা সিমা শাইন উল্লেখ করেন, নাসরাল্লাহর হত্যাকাণ্ড হিজবুল্লাহকে এতটাই দুর্বল করেছিল যে ২০২৪ সালের শেষদিকে তারা ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

“একটা সময় আসতে পারে যখন তারা বলবে — এটা আমাদের জন্য অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখনো সেখানে পৌঁছাইনি, তারা এখনো সেটা বলছে না, কিন্তু এমনটা ঘটতে পারে,” বলেন শাইন।

তিনি আরও বলেন, বাসিজ নামের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডারদের হত্যা করলে নিচুতলার সদস্যদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে, তারা হয়তো একদিন ঘুম থেকে উঠে কাজে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।

বিপরীত ফলের আশঙ্কা

তবে লারিজানির মতো শীর্ষ নেতাকে হত্যা বিপরীত ফলও আনতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। শাইনের মতে, লারিজানি ছিলেন একজন বাস্তববাদী নেতা, যিনি মধ্যপন্থী ও কট্টরপন্থী দু’পক্ষের সঙ্গেই কাজ করতে পারতেন। তার মৃত্যুতে বরং ক্ষমতা আরও কট্টরপন্থীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। যেমন- আইআরজিসির প্রধান অথবা পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, যিনি নিজেও সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার।

“যুদ্ধটা তারাই পরিচালনা করছে। আর আইআরজিসিকে শক্তিশালী করা মানে প্রতিরোধ জারি রাখা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং এমন দাবি তোলা যা আমেরিকা ও ইজরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়,” বলেন শাইন।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের নেতৃত্বের ভাণ্ডার এত গভীর যে কেবল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে সরকারকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। খামেনেই নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মুজতবা খামেনেইকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, যিনি নিজেও কট্টরপন্থী।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, “মাথা কেটে ফেলার কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আমার মনে হয় না আমরা এখনো ইরানের বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির ক্ষমতার গভীরতা বুঝতে পেরেছি।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, গাজায় হামাসের প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, হিজবুল্লাহর প্রধান ও তার উত্তরসূরিও নিহত — তবুও এই সংগঠনগুলো এখনও কার্যকর, যদিও দুর্বল হয়েছে।

“আমি বলছি না যে এই কৌশল গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু শুধু এটাকে ভিত্তি করে পুরো কৌশল গড়ে তোলা যায় না,” বলেন তিনি।

বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধান এবং নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার আমি আইয়ালন সতর্ক করে বলেন, ইরাকে সাদ্দাম হুসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার ফলে গণতন্ত্র নয়, বরং বিশৃঙ্খলাই জন্ম নিয়েছিল। “আমরা এখন এমন এক পরিস্থিতির খুব কাছাকাছি, যেখানে শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে,” বলেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন ও ইজরায়েলি নেতৃত্ব এই যুদ্ধের স্পষ্ট ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নেতানিয়াহুর বক্তব্য, “পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইরানের মানুষ সরকারকে উৎখাত করতে পারে” — তার মতে বিভ্রান্তিকর। “ধরে নিলাম নেতানিয়াহু ঠিক। তাহলে তা হতে মাস বা বছর লেগে যাবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই শাসনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, এবং তারা জানে যুদ্ধের পরদিনই তারা হয়তো হত্যার শিকার হবে। তাই তারা বাঁচার জন্য লড়বে, মারবে।” শেষে তিনি এক তীক্ষ্ণ উপমা টানেন — “দাবা খেলায় কিছু বোকা খেলোয়াড় ভাবে, শুধু রাজাকে মেরে ফেললেই জয় নিশ্চিত। কিন্তু মতাদর্শের যুদ্ধে প্রতিটি খেলোয়াড়ই গুরুত্বপূর্ণ — প্রতিটি মানুষই একেকটি শক্তি।”

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles