বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাস্তবতার যে গভীর ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা এখন আর পরিসংখ্যানের ঠান্ডা ভাষায় সীমাবদ্ধ নেই—এটি এক বিস্তৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া’ রিপোর্ট সেই চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে — ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৬ কোটি ৩০ লক্ষ স্নাতকের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ বেকার। অর্থাৎ, প্রতি ছয়জন স্নাতকের মধ্যে একজন কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। আরও উদ্বেগজনক, স্নাতক হওয়ার এক বছরের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ তরুণ-তরুণী কোনো স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় না — এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার দিকে আঙুল তোলে, যেখানে শিক্ষার ফলাফল ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে কোনো সুসংগত সেতু গড়ে ওঠেনি।

গত দুই দশকে ভারতে উচ্চশিক্ষার প্রসার অভূতপূর্ব। বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বেড়েছে দ্রুতগতিতে, এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নতুন গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু একইসঙ্গে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি সেই হারে হয়নি। বিশেষ করে সংগঠিত খাতে চাকরি তৈরির গতি অত্যন্ত ধীর। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ অনিশ্চিত, অস্থায়ী বা নিম্নমানের কাজে বাধ্য হচ্ছে, অথবা সম্পূর্ণ বেকার থেকে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্যই আজকের ভারতের ‘এডুকেটেড আনএমপ্লয়মেন্ট’-এর মূল সংকট।

এই সমস্যার পেছনে একাধিক স্তরের কারণ কাজ করছে। প্রথমত, শিক্ষার গুণমান এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। দেশের বহু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রম এখনও পুরোনো, শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যার কোনও মিল নেই। প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই, গ্রিন এনার্জি—এইসব দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রের জন্য যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তা অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারছে না। ফলে ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরিযোগ্যতা (employability) কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পসংস্থার সমীক্ষাও দেখিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই গ্র্যাজুয়েটদের একটি বড় অংশকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দিতে হয়, কারণ তারা সরাসরি কাজের জন্য প্রস্তুত নয়।

দ্বিতীয়ত, ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো নিজেই একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে। দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ হলেও, সেই বৃদ্ধি ‘জবলেস গ্রোথ’ -এর বৈশিষ্ট্য বহন করছে। পরিষেবা খাতের প্রসার হয়েছে, কিন্তু সেখানে উচ্চ দক্ষতার সীমিত চাকরি তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে উৎপাদন খাত, যা বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, তা প্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পায়নি। ছোট ও মাঝারি শিল্পের (MSME) ক্ষেত্রেও নানা নীতি-সংক্রান্ত বাধা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তৃতীয়ত, সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যও এই সমস্যাকে তীব্র করে তুলেছে। শহরাঞ্চলে কিছু সুযোগ তৈরি হলেও গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষিত যুবকদের জন্য বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে কম মজুরির কাজ নেয়, যা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন না, সামাজিক বাধা, নিরাপত্তা সমস্যা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে।

এই সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক। ব্যক্তিগত স্তরে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বাড়ছে। একইসঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিরও ক্ষতি হচ্ছে — বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত মানবসম্পদ উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত না হলে দেশের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ভারত যে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর স্বপ্ন দেখছে, তা যদি সঠিকভাবে কাজে না লাগানো যায়, তাহলে সেটি ‘ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সমাধানের পথও তাই বহুমুখী হতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন প্রয়োজন—পাঠ্যক্রমকে শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা, স্কিল-ভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খাত ও শ্রমনিবিড় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বৃহৎ পরিসরে চাকরি তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, স্টার্ট-আপ ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুলতে হবে, যাতে তরুণরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হিসেবেও উঠে আসতে পারে।

সবশেষে, এই সংকট কেবল অর্থনীতির নয়—এটি একটি সামাজিক চুক্তির প্রশ্ন। শিক্ষা যদি কর্মসংস্থানের পথ না খুলে দেয়, তবে সেই শিক্ষার প্রতি আস্থা কমে যায়। আর সেই আস্থা ভেঙে পড়লে, তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের উপর। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই ফাঁক পূরণ করা তাই এখন কোনো নীতিগত বিকল্প নয়, বরং একটি জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।