Home সংস্কৃতি ও বিনোদনখেলা “দ‍্য ওয়াল” হয়ে ওঠার যাত্রাপথেই জীবনকৃতি

“দ‍্য ওয়াল” হয়ে ওঠার যাত্রাপথেই জীবনকৃতি

0 comments 29 views
A+A-
Reset

সোমক রায়চৌধুরী: ১৯৯৬ লর্ডস টেস্ট। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারুদ্দিনের মন্তব‍্যে অপমানিত হয়ে সফরের মাঝপথ থেকেই দেশে ফিরে গেলেন নভজ‍্যোৎ সিং সিধু। এজব‍্যাস্টনে সিরিজের প্রথম টেস্টে ব‍্যাটিং ব‍্যর্থতার জন‍্য হেরে ভারত বেশ চাপে। গোড়ালির চোটের জন‍্য বিবেচনার বাইরে আরেক প্রতিষ্ঠিত ব‍্যাটসম‍্যান সঞ্জয় মঞ্জরেকার। এই পরিস্থিতিতে দুজন তরুণের একসঙ্গে অভিষেক ঘটল লর্ডসে, সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে। প্রথম ইনিংসে তিন নম্বরে নেমে অপ্রত‍্যাশিত সেঞ্চুরি(১৩১) করে কলকাতার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় রাতারাতি লর্ডসের নায়ক বনে গেলেন। সাত নম্বরে ব‍্যাট করতে গিয়ে ৯৫ রানের মাথায় ক্রিস লিউসের বল উইকেটকিপার জ‍্যাক রাসেলের হাতে খোঁচা দিয়ে শতরান হাতছাড়া করে পার্শ্ব নায়ক রয়ে গেলেন বেঙ্গালুরুর রাহুল দ্রাবিড়। লর্ডসের পর নটিংহ‍্যামে তৃতীয় টেস্টেও উপুর্যপুরি সেঞ্চুরি হাঁকালেন বাঁ হাতি সৌরভ, কিন্তু সাত নম্বরে গিয়ে আবার ৮৪ রানে আউট হয়ে ফিরে এলেন দ্রাবিড়। দুই নবাগত তরুণের ব‍্যাটে ভর করে দুটো টেস্টই সম্মানজনকভাবে ড্র করল ভারত। মাইক আর্থারটনের ইংল‍্যান্ডের বিরুদ্ধে আজহাররা সিরিজ হেরে ফিরলেও, সফর থেকে বিরাট প্রাপ্তি নিয়ে ফিরল ভারত — মিডল অর্ডারে সচিন তেন্ডুলকরের পাশে পাওয়া গিয়েছে দুটি নির্ভরযোগ্য ব‍্যাট।

ভারতীয় দল দেশে ফেরার পর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে যখন মিছিল আর উৎসব হচ্ছে শহর কলকাতায়, তখন বেঙ্গালুরুর ইন্দিরানগরের বাড়িতে বসে নিশ্চয়ই আক্ষেপে হাত কামড়েছিলেন রাহুল। সিরিজে অন্তত একটি সেঞ্চুরি না পাওয়ার হতাশায়! আসলে টেস্ট কেরিয়েরের প্রথম পর্বে এই “নার্ভাস নাইনটিজে” আক্রান্ত ছিলেন দ্রাবিড়। যা দেখে অনেকের মনে পড়ে যাচ্ছিল নার্ভাস-নাইনটিজ-খ‍্যাত প্রাক্তন ওপেনার চেতন চৌহানের কথা। বিপক্ষ বোলিং-এর সমস্ত ঝড় ঝাপটা সামলে আশি-নব্বই’এ পৌঁছে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শতরান যখন হাতের মুঠোয়, তখনই ঘটছিল ধৈর্য্যচ‍্যুতি। তাই প্রথম কুড়িটি টেস্টে তার সেঞ্চুরি ছিল মাত্র দুটি। তার টেম্পরামেন্ট নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছিল বিভিন্ন মহলে। কিন্তু রাহুল দ্রাবিড়রা অন‍্য ধাতুতে গড়া। তার ব‍্যাটিং টেকনিক তো প্রথম টেস্ট থেকেই নজর কেড়েছিল; অনুশীলন এবং দায়বদ্ধতার মাধ‍্যমে বাইশ গজের যে কোনও সমস্যা অতিক্রম করতে জানতেন এই দক্ষিণ ভারতীয় যুবক। আর তাই জন‍্যই গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের রাজ‍্য থেকে এলেও, কয়েক বছরের মধ‍্যেই তার ব‍্যাটিং-এ সুনীল মনোহর গাভাস্কারের ঘরানার ছাপ দেখতে পাওয়া শুরু করলেন ইমরান খানের মতো তাবড় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা!

বাংলা-মিডিয়ার প্রভাবে তখন বাঙালি, কলকাতা বা ইডেন গার্ডেনের গ‍্যালারি রাহুলের উন্নত ব‍্যাটিং-শৈলীর গুরুত্ব বুঝলেও, তাকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে! সৌরভ-রাহুল কিন্তু ভাল বন্ধু ছিলেন। ভারতের অধিনায়কত্ব পাওয়ার কিছুদিনের মধ‍্যেই ডেপুটি হিসেবে রাহুলের পক্ষেই পড়েছিল সৌরভের আস্থাভোট। তখনও বিশ্বক্রিকেটে ভারত সুপারপাওয়ার হওয়া থেকে বহু দূরে, এমন অবস্থায় ভারত সফরে এল স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া। টানা পনেরোটা টেস্ট জিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে স্টিভরা তখন ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন। প্রথম টেস্টে মুম্বাই’এ হেলায় ভারতকে উড়িয়ে দিয়ে টানা ষোলটি টেস্টে জয় পেলেন গ্লেন ম‍্যাকগ্রা-শেন ওয়ার্নরা। দ্বিতীয় টেস্টে ফলো অন করতে নেমে সচিন-সৌরভের উইকেট হারিয়ে ভারত যখন খাঁদের কিনারে, বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি আর স্টিভ ওয়ার মাঝখানে শুধু পেন্ডুলামের মতো দুলছে অপরাজিত শতরানকারী ভিভিএস লক্ষ্মণের ব‍্যাট, এই সন্ধিক্ষণে তৃতীয় দিনের পড়ন্ত বেলায় ছ’নম্বরে ক্রিজে এলেন রাহুল। আসল লড়াই শুরু হল চতুর্থ দিন সকাল থেকে। বিশ্বসেরা অস্ট্রেলিয় বোলিং-কে নির্বিষ করে দিনের তিন পর্ব মিলিয়ে ইডেনের বাইশ গজে লক্ষ্মণ-রাহুল রচনা করলেন এক মহাকাব‍্য; সারাদিন অপরাজিত থেকে তুললেন ৩৩৫ রান! পঞ্চমদিন সকালে রাহুলের রানআউটে পার্টনারশিপ ভাঙল যখন, পঞ্চম উইকেটে ৩৭৬ রানের ভারতীয় রেকর্ড গড়ে ফেলেছে এই দক্ষিণ ভারতীয় জুটি; যে রেকর্ড সিকিশতাব্দী পরও অক্ষুণ্ন! গাভাস্কার(ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ ব‍্যক্তিগত), রোহান কানহাইদের(ইডেনে সর্বোচ্চ) রেকর্ড ভেঙে লক্ষ্মণ থেমেছিলেন ২৮১’এ। আর উইকেটের একপ্রান্তে “দ‍্য ওয়াল” হয়ে উঠে রাহুল করলেন ১৮০ রান। সবথেকে বড় বিষয়, চতুর্থ দিনে এই জুটির ওই অবিস্মরণীয় ব‍্যাটিংই স্টিভ ওয়াদের মানসিকভাবে হারিয়ে দেয়! সম্মোহিত ইডেনের গ‍্যালারিতে সেদিন সব বাঁধ ভেঙে গেল, অতি বড় সৌরভ বা সচিনভক্তও উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করেছিলেন লক্ষ্মণ আর দ্রাবিড়কে। টেস্ট ইতিহাসে তৃতীয় দল হিসেবে ফলো অন করেও ম‍্যাচ জিতল টিম ইন্ডিয়া; দু’ইনিংসেই অফস্পিনার হরভজন সিং-এর সামনে অস্ট্রেলিয়রা অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন। এবং পরের চেন্নাই টেস্ট জিতে বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিও ঘরে তুললেন লক্ষ্মণ-রাহুল-হরভজনরা। স্টিভ ওয়াদের অশ্বমেধের ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়ল ভারতের মাটিতে; সেইসঙ্গে শুরু হল ভারতীয় ব‍্যাটিং-এর— সচিন-রাহুল-সৌরভ-লক্ষ্মণ সমৃদ্ধ “বিগ-ফোর” এর যুগ।

ইডেনের ওই ইনিংস ও এই সিরিজ জয় ব‍্যাটসম‍্যান রাহুল দ্রাবিড়ের আত্মবিশ্বাস নিঃসন্দেহে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর পরে কয়েকবছর ফর্মের চুড়োয় অধিষ্ঠান করলেন তো বটেই, বেঙ্গালুরুর জ‍্যামি থেকে হয়ে উঠলেন ভারতীয় ক্রিকেটের দুর্ভেদ্য “ওয়াল”। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা পাকিস্তান— বিদেশের মাটিতে একের পর এক স্মরণীয় ইনিংস। সচিনের থেকেও সৌরভের টিম ইন্ডিয়া তখন বেশি নির্ভরশী রাহুলের চওড়া ব‍্যাটের ওপর। কখনও ম‍্যাচ বাঁচাতে, কখনও ম‍্যাচ জিততে। ওভাল, অ্যাডিলেড, রাওলপিন্ডি– সর্বত্র দ্বিশতরান। ০৩’ অস্ট্রেলিয়া সফরে স‍্যর ডন ব্র‍্যাডম‍্যানের ঘরের মাঠ অ্যাডিলেড ওভালে পঞ্চম উইকেটে ভিভিএসের সঙ্গে আবার ৩০৩ রানের জুটি, ৮৫-৪ থেকে ম‍্যাচে ফেরাল নিশ্চিত ফলো অনের মুখে পড়া ভারতকে। অবিশ্বাস্য এই টেস্ট জয়ের নেপথ‍্যে দুই ইনিংসে রাহুলের ব‍্যাট থেকে এল যথাক্রমে ২৩৩ ও অপরাজিত ৭২! ৩০৩ রানের জুটিতে লক্ষণের অবদান ১৪৮। এই জয়ের সুবাদে ১৯৮৬’র পর অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম সিরিজ ড্র রেখে ফিরতে সক্ষম হল ভারত। এর কয়েকমাস পরই পাকিস্তানে সিরিজ নির্ধারক তৃতীয় টেস্টে অ্যাডিলেড ওভালের ইনিংসকেও ছাপিয়ে গেলেন দ্রাবিড়। তার ২৭০ রানের ইনিংস সৌরভদের সিরিজ জয়ে বড় ভূমিকা নিল। উল্লেখ্য, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আহত থাকায় সিরিজের প্রথম দুটি টেস্টে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন রাহুল, যার প্রথমটিতে ভারত জয় পেয়েছিল। নিখুঁত টেকনিকের জন‍্য সেরা বোলিং-এর বিরুদ্ধে বড় ইনিংস খেলার টেম্পরামেন্ট রাহুলের সহজাতভাবেই তৈরি হয়ে যায়। ক্রিকেট অভিধানের হেন কোনও শট নেই, যা বাইশ গজে তাকে খেলতে দেখা যায় নি! কিছূদিন আগে কলকাতায় এসে ব্রায়ান লারা বলে গিয়েছিলেন, “সব ঘরানার ক্রিকেটারই ক্রিকেটে তার নির্দিষ্ট অবদান রেখে যায়; যেমন যদি দীর্ঘক্ষণ ব‍্যাট করার প্রয়োজন হয়, তাহলে একজন রাহুল দ্রাবিড় বা জ‍্যাক ক‍্যালিসকে চাই”। টেস্টে ক‍্যালিসের থেকে রাহুল হয়ত সামান‍্য এগিয়েই থাকবেন। তাই তার টেস্ট কেরিয়েরের ইনিংসও বেশ দীর্ঘ। যে সুনীল গাভাস্কারের ছায়া তার মধ‍্যে দেখেছিলেন বিশেষজ্ঞরা, নিজের ষোল বছরের টেস্ট কেরিয়েরের শেষে সেই সুনীল গাভাস্কারকেও রেকর্ড বুকে ছাপিয়ে গেলেন রাহুল, ১৬৪টি টেস্টে বাহান্নর ওপর গড়ে তার সংগ্রহ ১৩,২৮৮ রান; সেঞ্চুরিও গাভাস্কারের থেকে দুটো বেশি–৩৬; যার মধ‍্যে পাঁচটি ডাবল! এছাড়া রয়েছে ৬৩টি অর্ধশতরান। টেস্ট ক্রিকেটে সবথেকে বেশি বল খেলার রেকর্ডও “দ‍্য ওয়ালের” দখলে।

সেইজন্যই বোধহয়, ২০২৬’এর বিসিসিআই জীবনকৃতি পুরষ্কার কর্নেল সিকে নাইডু ট্রফির জন‍্য রাহুল দ্রাবিড়ের থেকে যোগ‍্যতম ব‍্যক্তি আর কেউ হতেন না। ১৯৯৪’এ এই পুরস্কার চালু করে ভারতীয় বোর্ড। গাভাস্কার, কপিলদেব বিষেন সিং বেদী, এরাপল্লি প্রসন্ন, দিলীপ বেঙ্গসরকর সহ বহু কিংবদন্তি ক্রিকেটার এই পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় রয়েছেন। যার সঙ্গে জুটি বেঁধে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ৬৯২০ রানের রেকর্ড করেছেন রাহুল, সেই সচিন তেন্ডুলকর গতবার এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। এবার রাহুলের সঙ্গে এই পুরস্কার পেলেন আরেক কন্নড়, ১৯৮৩’র বিশ্বজয়ী দলের সদস‍্য তথা প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি রজার বিনি; ও মহিলা বিভাগে ভারতীয় ক্রিকেটে অবদানের জন‍্য জীবনকৃতি সম্মানে ভূষিত হলেন প্রাক্তন অধিনায়ক মিথালি রাজ। তিন নম্বরে মিথালির ব‍্যাটিং-স্টাইল ও টেকনিকে পাওয়া যেত রাহুলের দর্শন।

ব‍্যাটসম‍্যান বা ক্রিকেটার রাহুলের বাইরে ব‍্যক্তি রাহুলের কীরকম ইমেজ পাওয়া যায়? ধীর-স্থির, ঠান্ডা মাথার সিরিয়াস এক ব‍্যক্তিত্ব। সফরের যাত্রাপথে বই পড়তে ভালবাসতেন, বিভিন্ন বিষয় আগ্রহ ছিল; বেশ অ্যাকাডেমিক ধরণের, ক্রিকেটের এক মেধাবী ছাত্র। আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া, মেজাজ হারানো, বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, এসব ভারতীয় ক্রিকেটের “দ‍্য ওয়াল”-এর চরিত্রে ছিল না। এক্ষেত্রে তার সমসাময়িক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করতেন রাহুল। অধিনায়ক সৌরভ যেমন আগ্রাসী আচরণ আর মন্তব্যের জন‍্য মাঠে ও মাঠের বাইরে, বিপক্ষ অধিনায়ক থেকে, আম্পায়ার, কোচ— সবার সঙ্গে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন; তার উলটো রাস্তায় হেঁটে রাহুল খেলোয়াড়, ক‍্যাপ্টেন, কোচ, তিন ভূমিকাতেই বিতর্ক এড়িয়ে চলতে ভালবাসতেন। তার ব‍্যাটিং-এর জমাট রক্ষণ আর সংযমী মানসিকতার প্রভাব তার ব‍্যক্তিত্বেও ছিল।

দশ বছর বয়সে লর্ডসে কপিলদেবের বিশ্বকাপ নেওয়ার মুহূর্ত দেখেছিলেন, যা বহু ভারতীয় কিশোরের মতো বেঙ্গালুরুর সেন্ট যোসেফ ইস্কুলের ছাত্রকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। তার ক্রিকেটপ্রেমী বাবা শারদ দ্রাবিড়ই যে তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে মূল অনুপ্রেরণা, তা জীবনকৃতি পুরস্কার নেওয়ার পর জানাতে ভোলেননি দ্রাবিড়। ছোটবেলা থেকেই খেলা আর অনুশীলনের ব‍্যাপারে ভয়ঙ্কর সিরিয়াস রাহুল নজরে পড়েন কোচ কেকি তারাপোরের। এরপর কর্ণাটকের বয়সভিত্তিক সবকটি দলে খেলেই সিনিয়র দলে আসেন। বাইশ গজে রাহুলের মুখচোখেও সর্বক্ষেত্রে ধরা পড়ত এই ধৈর্য্য আর ফোকাস; এমন এক যুবক, যিনি ক্রিকেট ও ব‍্যাটিং এর প্রতি একশো শতাংশ নিবেদিতপ্রাণ।

একবার ওয়ানডে টিম থেকে বাদ পড়লেন মন্থর ব‍্যাটিং-এর জন‍্য। মিডিয়ায় একাংশ ঘোষণা করল সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দ্রাবিড় অচল পয়সা। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি রাহুল দ্রাবিড়দের দায়বদ্ধতা এমনই পর্যায়ে যে শুধু ফিরেই এলেন না দলে, কেরিয়েরের শেষে দেখা গেল ওয়ানডেতে তার নামের পাশে রয়েছে দশ হাজার আটশোর ওপর রান; ১২ টা সেঞ্চুরি, ৮৩ টি অর্ধশতরান, সর্বোচ্চ ১৫৩, গড় চল্লিশের সামান‍্য নীচে। অধিনায়ক সৌরভের একটা বাড়তি ব‍্যাটসম‍্যান খেলানোর কৌশল রূপায়িত করতে দলের স্বার্থে আপাদমস্তক টিমম‍্যান রাহুল বছর তিনেক টানা উইকেটকিপিং করে দিলেন; তাই তার সংগ্রহে ১৯৬টা ক‍্যাচ ও ১৪ টা স্টাম্পিংও। আর টেস্ট ক্রিকেটে স্লিপ বিশেষজ্ঞ ও ফিল্ডার দ্রাবিড় নিয়েছেন ২১০টি ক‍্যাচ–যে বিশ্বরেকর্ড গত জুলাই’এ অ্যাশেজ সিরিজে ভাঙলেন জো রুট।

অফফর্ম আর গ্রেগ চ‍্যাপেলের সঙ্গে বিতর্কের জেরে ০৫’এ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় দল থেকে বাদ পড়ায় ভারতের অধিনায়ক হন দ্রাবিড়। টানা দু’বছর অধিনায়ক ছিলেন, ০৬’এ ওয়েস্টইন্ডিজে সিরিজ জিতল ভারত। কিন্তু ক‍্যাপ্টেন দ্রাবিড় সেরকম ছাপ ফেলতে পারেন নি; এই পর্বে অধিনায়কের থেকে টিমের ওপর কোচ গ্রেগ চ‍্যাপেলের অনেক বেশি প্রভাব ছিল। ওয়েস্টইন্ডিজ ০৭’এ বিশ্বকাপে শোচনীয় ব‍্যর্থতার পর নেতৃত্ব হারালেন রাহুল। ক‍্যাপ্টেন হিসেবে যতটা আগ্রাসী হওয়ার কথা তা হতে পারেন নি ভারতীয় ব‍্যাটিং-এর “দ‍্য ওয়াল”! তবে ব‍্যাটসম‍্যান দ্রাবিড় স্বমহিমায় বিরাজ করেছেন ২০১২ পর্যন্ত, ভারতের মিডল ওর্ডারের ধারাবাহিক স্তম্ভ হয়ে। ২০১১’এ ইংল‍্যান্ডের বিরুদ্ধে পরপর তিনটি শতরান তারই সাক্ষ‍্য দেয়।

অবসরের পর তাকে কোচিং-এ নিয়ে আসেন বিসিসিআই কর্তারা। প্রথমে বেঙ্গালুরুর এনসিএতে জুনিয়র ভারতীয় দলের দায়িত্বে। ওই দলকে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বচ‍্যাম্পিয়ন করলেন দ্রাবিড়। এরপর তদানীন্তন বোর্ড সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়র উদ‍্যোগে সিনিয়র ভারতীয় দলের দায়িত্ব পান তিনি। ২০২৩ বিশ্বকাপে তার কোচিং-এ টানা দশটি ম‍্যাচ জিতে ফাইনালে হেরে যান রোহিত শর্মারা। ২০২৪’এ বার্বাডোজে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতে শাপমোচন করলেন রাহুল-রোহিতরা। তার যুগে টি-২০ ক্রিকেটের সেরকম চল ছিল না, দেশের হয়ে দ্রাবিড় একটি মাত্র কুড়ি-২০ ম‍্যাচ খেলেছিলেন! চ‍্যাম্পিয়ন দলের হেডকোচ হিসেবে বোর্ড তাকে বাড়তি অর্থ পুরস্কার হিসেবে দিতে চাইলে সবিনয়ে তা প্রত‍্যাখ‍্যান করে দ্রাবিড় বলেছিলেন, “কোচিং টিমের সবার অবদান সমান, তাই সবার সমান অর্থই আমার প্রাপ‍্য”!

জীবনকৃতি পুরস্কার নিয়ে অবশ‍্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে দেখা গেল সদা সংযমী দ্রাবিড়কেও। ৫৩ বছর বয়সী নিজেদের সময়ে আবদ্ধ না থেকে বারবার উল্লেখ করলেন ভারতীয় ক্রিকেটের সাম্প্রতিক সাফল‍্যের কথা। নিজের বাবা-মা ও স্ত্রী বিজেতা পেনধরকরকে কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি অভিনন্দন জানালেন বর্তমান প্রজন্মের সব ক্রিকেটার ও কোচিং স্টাফদের।

কোচ, ক‍্যাপ্টেনের এর অনেক উর্ধ্বে অবস্থান ব‍্যাটসম‍্যান, ক্রিকেটার ও ব‍্যক্তি রাহুল দ্রাবিড়ের, ক্রিকেটের নন্দনতত্ত্বের নিরিখে। হেলমেটের নীচে মাথা ফেটে দেখা যাচ্ছে রক্তের রেখা, কোনও ভ্রুক্ষেপ না করেই বিশ্বের সেরা বোলারদের বিরুদ্ধে বাইশ গজে এক যুবকের কপিবুক ব‍্যাটিং আর অদম‍্য লড়াই’এর দৃশ‍্যগুলো ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আজও ভীষণরকম জীবন্ত।
ভারতীয় ক্রিকেটে এরকম নান্দনিক “ওয়াল” আর কখনও আসবে কি?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles