বাংলাস্ফিয়ার: সম্প্রতি প্রকাশিত নীতি আয়োগের Fiscal Health Index (FHI) ২০২৬—যা মূলত ২০২৩–২৪ অর্থবর্ষের তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি—সেখানে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ১৮টি প্রধান রাজ্যের মধ্যে ১৬তম স্থানে রয়েছে। রাজ্যের মোট স্কোর ২৩.৮। এই স্কোর অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গকে “Aspirational” বা নিম্নস্তরের বিভাগে রাখা হয়েছে, কারণ এই সূচকে ২৫ বা তার কম স্কোর পাওয়া রাজ্যগুলোকে সেই শ্রেণিতে ফেলা হয়। এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নিচে রয়েছে শুধু আন্ধ্রপ্রদেশ এবং পাঞ্জাব।
সহজ ভাষায় এর অর্থ হল, নীতি আয়োগের এই মূল্যায়ন অনুযায়ী ভারতের আর্থিকভাবে শক্তিশালী রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এখন নেই। বরং রাজ্যের সরকারি অর্থব্যবস্থায় কিছু গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে—বিশেষ করে নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা, ঋণের বোঝা, এবং বাজেট ঘাটতির চাপ।
Fiscal Health Index তৈরি করা হয়েছে মূলত পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে। এগুলি হল—
- সরকারি ব্যয়ের গুণমান (Quality of Expenditure)
- রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা (Revenue Mobilisation)
- আর্থিক শৃঙ্খলা বা Fiscal Prudence
- ঋণ সূচক বা Debt Index
- ঋণ টেকসইতা বা Debt Sustainability
এই পাঁচটি ক্ষেত্র মিলিয়ে একটি রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল তা নির্ধারণ করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা সব ক্ষেত্রেই সমান নয়। কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যের অবস্থান মাঝামাঝি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় Quality of Expenditure সূচকে পশ্চিমবঙ্গের স্কোর ৩৭.৪, এবং সেখানে রাজ্যের অবস্থান ১৩তম। এই বিভাগে রাজ্যকে “Performer” বা মাঝারি পর্যায়ের পারফরম্যান্সের রাজ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যয়ের গঠন বা কোথায় টাকা খরচ করা হচ্ছে—সেই দিক থেকে পরিস্থিতি খুব খারাপ নয়।
কিন্তু অন্যান্য সূচকে পশ্চিমবঙ্গের ফল অনেক দুর্বল।
Revenue Mobilisation–এ রাজ্যের স্কোর ১২.৯ এবং অবস্থান ১৭তম।
Fiscal Prudence–এ স্কোর ২২.৭ এবং অবস্থান ১৩তম।
Debt Index–এ স্কোর ২০.১ এবং অবস্থান ১৭তম।
Debt Sustainability–এ স্কোর ২৫.৬।
এই পরিসংখ্যান থেকে একটি স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান সমস্যা হল রাজস্ব ভিত্তির দুর্বলতা। অর্থাৎ রাজ্য নিজে কতটা কর ও অন্যান্য উৎস থেকে আয় করতে পারছে—সেই জায়গাটিই সবচেয়ে দুর্বল।
নীতি আয়োগের রিপোর্ট সরাসরি বলছে, পাঞ্জাব, আন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালা—এই রাজ্যগুলো এখনও fiscally stressed, অর্থাৎ তাদের সরকারি অর্থব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্থিতিশীল রাজস্ব ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং সীমিত রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা।
সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত এসেছে রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে। এই সূচকে পশ্চিমবঙ্গ ১৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৭তম। কেবল বিহার তার নিচে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব রাজস্বের বৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে খুব ধীরগতির, ফলে রাজ্যের ব্যয়ের তুলনায় নিজের আয়ের অংশ কম।
এর অর্থ হল, পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান এবং ভাগাভাগি করের উপর তুলনামূলক বেশি নির্ভর করতে হয়।
একটি রাজ্যের আর্থিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হল তার নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা। যদি রাজ্য নিজের কর ও অন্যান্য উৎস থেকে পর্যাপ্ত আয় করতে না পারে, তাহলে তাকে হয় বেশি ঋণ নিতে হয়, নয়তো কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভর করতে হয়। নীতি আয়োগের মূল্যায়ন অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি বেশ স্পষ্ট।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হল Fiscal Prudence, অর্থাৎ বাজেট ব্যবস্থাপনায় আর্থিক শৃঙ্খলা। এই সূচকে পশ্চিমবঙ্গের স্কোর ২২.৭। রাজ্যের FRBM আইন (Fiscal Responsibility and Budget Management Act) অনুযায়ী লক্ষ্য হল রাজস্ব উদ্বৃত্ত বজায় রাখা এবং আর্থিক ঘাটতি GSDP-এর ৩ শতাংশের মধ্যে রাখা।
কিন্তু রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি এখনও প্রায় ১.৬ শতাংশ। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই ঘাটতি কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যখন একটি রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি থাকে, তখন তার অর্থ দাঁড়ায়—সরকার কেবল উন্নয়নমূলক কাজের জন্য নয়, চলতি খরচ চালাতেও ঋণ নিচ্ছে।
তৃতীয় বড় দুর্বলতা হল ঋণের বোঝা। Debt Index-এ পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ১৭তম। রিপোর্ট অনুযায়ী রাজ্যের মোট ঋণ GSDP-এর প্রায় ৩৭.৬৭ শতাংশ। FRBM লক্ষ্য অনুযায়ী এটি ৩৪.৩ শতাংশে নামানোর কথা।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, সুদ বাবদ খরচ বছরে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ৪২,৬২০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই সুদ পরিশোধ এখন রাজ্যের মোট রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে রাজ্যের মোট দায় বা outstanding liabilities প্রায় ৬.৪ লক্ষ কোটি টাকা।
এটি নীতিনির্ধারকদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। কারণ যখন রাজস্বের বড় অংশ সুদ পরিশোধে চলে যায়, তখন উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করার জন্য সরকারের হাতে অর্থ কমে যায়।
তবে একটি সূক্ষ্ম দিকও আছে। Debt Sustainability সূচকে পশ্চিমবঙ্গের স্কোর ২৫.৬, যা অন্য কিছু ঋণ সূচকের তুলনায় সামান্য ভালো। এর অর্থ হল ঋণ পরিস্থিতি একেবারে অস্থিতিশীল নয়, কিন্তু মোট ঋণের পরিমাণ এবং সুদের চাপ এখনও যথেষ্ট বেশি।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। গত এক দশকের গড় হিসাবেও পশ্চিমবঙ্গ প্রায় সব সময়ই নিচের দিকের রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ এটি এক বছরের সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা।
নীতি আয়োগের সারাংশ অনুযায়ী পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালা—এই রাজ্যগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ ও ঋণের সমস্যা স্থায়ীভাবে দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, Fiscal Health Index-এ পশ্চিমবঙ্গকে এমন একটি রাজ্য হিসেবে দেখা হয়েছে যেখানে—
- রাজস্ব ভিত্তি দুর্বল
- ঋণের বোঝা বেশি
- সুদের খরচ দ্রুত বাড়ছে
- বাজেটের নমনীয়তা কমছে
তবে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি সমান খারাপ নয়। সরকারি ব্যয়ের গুণমান মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা এবং ঋণের চাপ মিলিয়ে রাজ্যের আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাস্তবে এটি একটি চক্রের মতো। রাজ্যের বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যয় রয়েছে, কিন্তু রাজস্ব দ্রুত বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি তৈরি হয়, ঋণ বাড়ে, সুদের খরচ বাড়ে, এবং ভবিষ্যতের বাজেট আরও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখানে দুটি সতর্কতা মাথায় রাখা দরকার।
প্রথমত, Fiscal Health Index একটি সরকারি অর্থব্যবস্থার সূচক, এটি রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতি বা সমাজকল্যাণের সূচক নয়। দ্বিতীয়ত, এই রিপোর্ট ২০২৩–২৪ অর্থবর্ষের তথ্যের উপর ভিত্তি করে, তাই এটি ২০২৬ সালের একেবারে বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়।
সব মিলিয়ে নীতি আয়োগের মূল্যায়নে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থানকে দুর্বল এবং কাঠামোগতভাবে সমস্যাগ্রস্ত বলা হয়েছে। রাজ্যটি বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রায় নিচের দিকেই রয়েছে, এবং প্রধান সমস্যা হল রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা এবং ঋণের চাপ।