Home খবর স্বখাত সলিলে ডুবে মরছেন ট্রাম্প

স্বখাত সলিলে ডুবে মরছেন ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধ কাঁপিয়ে দিয়েছে বিশ্ব-অর্থনীতির ভিত

by Suman Chattopadhyay
0 comments 3 views
A+A-
Reset

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে শুল্কযুদ্ধের খরচ আবিষ্কার করেছিলেন। এখন তিনি আবিষ্কার করছেন যুদ্ধের খরচ। ৯ মার্চ তিনি ঘোষণা করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযান “খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।” এই ঘোষণা বাজারে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আগের দিন যেখানে তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছেছিল, তা হু হু করে নেমে আসে প্রায় ৮০ ডলারে—যদিও যুদ্ধ শুরুর আগে দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। কিন্তু পরিস্থিতি এত সহজ নয়। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় ১৫ শতাংশ আটকে গেছে। ট্রাম্প, যিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি এবং যাদের ভোটাররা মুদ্রাস্ফীতিতে ক্লান্ত, তিনি স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছেন যে এই খরচ তিনি বহন করতে পারছেন না, ঠিক যেমন গত বসন্তে বাজার ধসে পড়তেই তিনি তার বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সরে এসেছিলেন।

 

কিন্তু যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে ট্রাম্প যেমন অনিশ্চিত, অর্থনৈতিক নীতিতেও তিনি তেমনই বিশৃঙ্খল। এই লেখাটি প্রকাশের সময়ও হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ আছে, কারণ ইরান সেখানে জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তেলের দাম আবার বেড়ে প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে। একই সঙ্গে আমেরিকার বক্তব্য ছিল যুদ্ধংদেহী। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন যে যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

 

এই বিভ্রান্তি আসলে প্রেসিডেন্টের সীমিত বিকল্পেরই প্রতিফলন। বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসা তার নিজের হাতে ছিল, কিন্তু জ্বালানি বাজারকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া তার ক্ষমতার বাইরে। যা-ই ঘটুক না কেন, বিশ্ব এখন এক নতুন জ্বালানি অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করছে।

 

এই যুদ্ধ যে ধাক্কা দিয়েছে তা বিশাল হতে পারে। অবশ্য একথাও  সত্য যে আজকের বিশ্ব ১৯৭৩ সালের মতো তেলের ওপর এতটা নির্ভরশীল নয়, যখন আরব দেশগুলির তেল অবরোধের কারণে তেলের দাম চারগুণ হয়ে গিয়েছিল। কিংবা ১৯৭৯-৮০ সালের মতোও নয়, যখন ইরানের বিপ্লব ও ইরান-ইরাক যুদ্ধ সরবরাহে বড় আঘাত হেনেছিল। সেই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তেল ব্যবহার করা হতো। আজ তেলের ব্যবহার অনেকটাই সীমিত, মূলত পরিবহন এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে।

 

তবে এই পরিবর্তনের একটি বিপজ্জনক দিকও আছে। আজকের তেলের চাহিদা খুব সহজে কমে না। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও দাম অনেক বেশি বাড়ে। আর বর্তমান সঙ্ঘাতটি বিশেষভাবে গুরুতর। সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা ১৯৭০-এর দশকের কোনো ধাক্কার চেয়েও বড়। তবু বাজার এখনও ধরে নিচ্ছে না যে হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকবে। যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে তা বন্ধ থাকে, তাহলে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য আনতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলির কাছে জরুরি মজুত হিসেবে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যার মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ইতিমধ্যে বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু পাইপলাইন ও পরিবহন পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই মজুত দ্রুত ব্যবহার করা সহজ নয়। এমনকি চীন, যাদের নিজস্ব বিশাল মজুত আছে, তারাও কিছু পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। যেহেতু পরিবহন আধুনিক অর্থনীতির প্রায় সব খাতে অপরিহার্য, তাই জ্বালানি সরবরাহে বাধা গুরুতর অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

 

সংকট কেবল তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। ড্রোন হামলার পর কাতারের প্রধান এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র এখনও বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। কাতারের উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও স্থগিত হয়েছে। এর ফলে এশিয়ায় গ্যাসের জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছে। ইউরোপে, যেখানে বছরের এই সময়ের তুলনায় গ্যাসের মজুত অস্বাভাবিকভাবে কম, দাম অর্ধেকের বেশি বেড়ে গেছে। আমেরিকা চাইলে আরও এলএনজি রফতানি করতে পারে, কিন্তু সেখানে ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তারের কারণে নিজস্ব গ্যাসের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।

 

ইরান হয়তো যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করবে, যাতে বোঝানো যায় যে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই। ১১ মার্চ তারা হরমুজ প্রণালীতে তিনটি মালবাহী জাহাজে হামলা চালায় এবং পরে ইরাকের কাছে আরও দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আঘাত করে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতোই -যারা লোহিত সাগরে কম প্রযুক্তির অস্ত্র দিয়ে ন্যাটোর উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ফাঁকি দিয়ে জাহাজে হামলা চালাতে পেরেছে, ইরানও বুঝে গেছে যে ড্রোন ব্যবহার করে জাহাজ ও জ্বালানি পরিকাঠামোতে আঘাত হানা সম্ভব—যদিও তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে বোমা বর্ষণ চলছে।

 

যুদ্ধ শেষ হলেও পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। ইরানের নতুন কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই এখন জেনে গিয়েছেন যে জ্বালানির দামই আমেরিকার দুর্বল জায়গা। ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষা হয়েছে, তবু অনেক ড্রোন লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে। আমেরিকান সেনারা ইরান দখল করতে যাচ্ছে না, যাতে এসব হামলা পুরোপুরি থামানো যায়। এমনকি আমেরিকা যদি ট্যাঙ্কারগুলিকে সস্তা বিমা সুবিধা দেয়, তবুও প্রতিটি জাহাজকে রক্ষা করার মতো সামর্থ্য তার নেই। ফলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেই জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বারবার ফিরে আসবে—বিশেষ করে যদি ইরান মনে করে নিরাপদ থাকতে হলে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োজন।

 

এই নতুন বাস্তবতায় বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারকদের সবাইকে কাজ করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বিষয়টি স্পষ্ট, বিশ্ব যত অস্থির হয়ে উঠছে, শেয়ারবাজারের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তার তত বড় বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ইতিমধ্যে বাজারের কাছে এক দীর্ঘ হুমকির তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বেসরকারি ঋণবাজারের সমস্যা এবং ঋণে ডুবে থাকা সরকারগুলির প্রতি আস্থাহীনতা। সঙ্কট শুরুর পর থেকেই সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ ইউরোপ এবং ব্রিটেনে, যারা আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল।

 

ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম এখন সবসময় যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রতিফলিত করবে। মহামারির পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় যেমন হয়েছিল, তেমনি আবারও কোম্পানিগুলিকে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল খতিয়ে দেখতে হবে,বিশেষ করে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, যাদের স্থিতিশীলতার খ্যাতি এখন ধাক্কা খেয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও পর্যটন কমতে পারে।

 

নীতিনির্ধারকদের সামনে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। জ্বালানি মজুত বাড়ানো তার একটি অংশ। যুদ্ধের আগে যখন তেলের দাম কম ছিল, তখন আমেরিকার তেল মজুত পুনরায় পূরণ না করা ট্রাম্পের বড় ভুল ছিল। এখন সেই মজুত বাড়াতে অনেক বেশি খরচ হবে। উচ্চ মূল্য হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহ দেবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত আমেরিকার মতো দেশগুলির পক্ষে জ্বালানি রফতানি নিয়ন্ত্রণের প্রলোভন এড়িয়ে চলা কঠিন হবে। যখন তেল উৎপাদক ও শোধনকারী দেশ—যেমন চীন বা ভারত—নিজেদের ভোক্তাদের রক্ষা করতে রফতানি সীমিত করে, তখন অন্য দেশগুলির ওপর তার প্রভাব ভয়াবহ হয়।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলিকেও নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির হুমকির মুখে পড়তে হবে। এতে মন্দা এবং মজুরি-মূল্য সর্পিল গতিতে এগোবে, ঝুঁকি বাড়বে। রাজনীতিবিদদেরও ভোটারদের চাপের মুখে জ্বালানি ভর্তুকি দিতে হতে পারে—যেমন ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে হয়েছিল, যেখানে অনেক দেশে এই ভর্তুকি জিডিপির ২.৫ শতাংশের বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং সরকারি ঋণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দরিদ্র দেশগুলি, বিশেষ করে এশিয়া, যেমন ২০২২ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা গিয়েছিল।

 

এই সঙ্কট কীভাবে শেষ হবে তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও দরিদ্র, আরও অস্থির এবং শাসন করা আরও কঠিন করে তুলেছে।

 

 

 

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles