মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের এক মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান সামরিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজও হরমুজ দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং বিশেষত ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে রফতানি হওয়া তেল ও গ্যাসের প্রধান রুটই এই প্রণালী।
ভারতের ওপর সরাসরি আঘাত
ভারতের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হিসেবে ভারতের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে, এবং সেই তেলের বেশিরভাগই হরমুজ হয়ে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছায়। প্রণালীতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হলে রিফাইনারিগুলিতে কাঁচা তেলের সরবরাহ কমে যাবে, এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটবে এবং শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হবে। ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাস ও সিএনজি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থান। ভারতীয় সূত্রগুলির একাংশ দাবি করেছিল যে ভারত-ইরান সম্পর্কের ঐতিহাসিক গভীরতা এবং পশ্চিমা সামরিক জোটে ভারতের অনুপস্থিতির কারণে ভারতীয় ট্যাঙ্কারগুলিকে হয়তো বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু ইরানের মুখপাত্রের বক্তব্য সেই আশাকে অনিশ্চিত করে দিয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোন জাহাজ চলবে আর কোনটি চলবে না, তা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামরিক হিসাবের উপর নির্ভর করবে।
হরমুজ: ইরানের কৌশলগত অস্ত্র
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজকে ঘিরে ইরানের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে একটি সুচিন্তিত বৃহত্তর কৌশল। আমেরিকা বা ইজরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে সমান শক্তিতে পেরে না উঠলেও, হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলার যথেষ্ট সামর্থ্য ইরানের রয়েছে। প্রণালীতে অবরোধ বা আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিলেই বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যার ধাক্কা পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনীতিতেও পড়ে। এভাবে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে ইরান।
ইতিমধ্যেই বহু বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজের বাইরে অপেক্ষা করছে এবং কিছু জাহাজকে পথ পরিবর্তন করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে প্রণালীর আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলি নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন শুরু করেছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্পষ্ট। তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী এবং এলএনজির বাজারেও দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শুধু তেল বা গ্যাস নয়, সার উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসও এই একই পথে যায়। ফলে হরমুজের পরিস্থিতি এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘর্ষের বিষয় নয়, এটি সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।
বিকল্প খোঁজার চেষ্টা, সমাধান অধরা
পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতসহ বহু দেশ বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করেছে। রাশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার করার বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সহজ নয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ইরান সম্পূর্ণভাবে ভারতকে প্রতিপক্ষে পরিণত করতে আগ্রহী কি না, সেটি এখনো অস্পষ্ট। চাবাহার বন্দর প্রকল্পে ভারত-ইরান সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে সম্পূর্ণ বৈরী নয়। তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু সামরিক উত্তেজনা বাড়লে যে কোনো মুহূর্তে অবস্থান পাল্টে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।