বাংলাস্ফিয়ার: গত ১১ই মার্চ সুপ্রিম কোর্ট অষ্টম শ্রেণির এনসিইআরটি পাঠ্যবইয়ে ‘বিচার বিভাগে দুর্নীতি’ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত অধ্যায় রচনার সঙ্গে যুক্ত তিন বিশেষজ্ঞকে কালো তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই শিক্ষামহলে তীব্র অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই নির্দেশ কি আদৌ ন্যায়সঙ্গত? উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে অভিযুক্তদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম—অধ্যাপক মিশেল দানিনোর কাজ ও গবেষণার দিকে।

আদালতের নির্দেশ যা ঝড় তুলেছে

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এনসিইআরটি পরিচালকের প্রতিক্রিয়াকে “উদ্বেগজনক” বলে চিহ্নিত করে। আদালত জানতে পারে, নতুন বিশেষজ্ঞদের নাম বা অনুমোদনের প্রক্রিয়া গোপন রেখেই বিতর্কিত অধ্যায়টি পুনরায় লেখা হয়েছিল।

এনসিইআরটি পরিচালক দিনেশ প্রসাদ সাকলানি একটি হলফনামায় জানান, অধ্যাপক মিশেল দানিনো এই অধ্যায়টি লেখার তদারকি করেছিলেন। এছাড়া শিক্ষাবিদ সুপর্ণা দিবাকর এবং আইনি গবেষক অলক প্রসন্ন কুমারও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।

আদালত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, এই তিনজনকে যেন সরকারি তহবিলে পরিচালিত কোনো কাজে যুক্ত না করা হয়। একইসঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, “আমাদের সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই যে অধ্যাপক মিশেল দানিনো, মিস দিবাকর এবং মিস্টার অলক প্রসন্ন কুমারের হয় ভারতীয় বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই, অথবা তাঁরা জেনেশুনে তথ্য বিকৃত করেছেন যাতে অষ্টম শ্রেণির কোমলমতি পড়ুয়াদের সামনে বিচারবিভাগের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা যায়।” তবে আদালত এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে, তিনজনের যে কেউ চাইলে এই আদেশ পরিবর্তনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন।

কে এই মিশেল দানিনো?

১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের হঁফ্লুরে জন্মগ্রহণকারী মিশেল দানিনো একজন ফরাসি বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক, পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ। ১৯৭৭ সাল থেকে ভারতে বসবাসকারী দানিনো এখন ভারতের নাগরিক। শ্রী অরবিন্দ ও অরোভিলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোটবেলা থেকেই ভারতীয় সভ্যতার প্রতি আগ্রহী দানিনো ক্রমে প্রাচীন ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ গবেষকে পরিণত হন। বর্তমানে তিনি আইআইটি গান্ধীনগরের ভিজিটিং প্রফেসর এবং সেখানকার আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য লস্ট রিভার: অন দ্য ট্রেইল অফ দ্য সরস্বতী’ (২০১০) এবং ‘ইন্ডিয়ান কালচার অ্যান্ড ইন্ডিয়াজ ফিউচার’ (২০১১)।

সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য তাঁর সমালোচকদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত কয়েক বছর ধরেই শিক্ষামহল ও সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ দানিনোকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। অভিযোগ পরিচিত, তিনি প্রাচীন ভারতের সাফল্য নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেন, সরস্বতী নদীর অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি দেন এবং আর্য আক্রমণ তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সমালোচকদের দাবি, তাঁর সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণের চেয়ে মতাদর্শ দ্বারা বেশি চালিত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই অভিযোগকারীরা কি আদৌ তাঁর কাজ গভীরভাবে পড়েছেন?

প্রমাণের ভিত্তি আসলে কী?

দানিনোর বই ‘দ্য লস্ট রিভার’ ঋগ্বেদে বর্ণিত সেই সরস্বতী নদীকে নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা, যা পরবর্তীকালে হারিয়ে গেছে বলে ধরা হয়। এই নদীর বাস্তব অস্তিত্ব রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দানিনো তাঁর যুক্তি সাজিয়েছেন বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে। তিনি ব্যবহার করেছেন:

• জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ।

• নাসা (NASA), ফ্রান্সের SPOT এবং ভারতের IRS স্যাটেলাইটের ছবি।

• ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের (BARC) বিজ্ঞানীদের দ্বারা ভূগর্ভস্থ জলের আইসোটোপ ডেটিং।

• আমেরিকান হাইড্রোলজিস্ট রবার্ট রাইকসের ড্রিলিং ডেটা।

• জার্মান বিজ্ঞানীদের করা চোলিস্তান মরুভূমির হাইড্রো-জিওলজিক্যাল সার্ভে।

• ইসরো (ISRO)-র বিজ্ঞানীদের রিমোট-সেন্সিং গবেষণা।

অর্থাৎ, যে বইয়ের প্রমাণের ভিত্তি চারটি মহাদেশ, দুই শতাব্দীর স্কলারশিপ এবং অন্তত ছয়টি বিজ্ঞান শাখা জুড়ে বিস্তৃত, তাকে কেবল ‘মতাদর্শগত’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। নাসার স্যাটেলাইট ইমেজ বা জার্মানির জল-বিজ্ঞান ভারতের রাজনীতির কথায় চলে না। হয় এই বিজ্ঞান সঠিক, নয়তো ভুল—সমালোচকদের উচিৎ তথ্যের ভিত্তিতে তাকে চ্যালেঞ্জ করা।

পণ্ডিত না প্রচারক—কোথায় দাঁড়িয়ে দানিনো?

দানিনোর কাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাঁর বইতে বারবার স্বীকার করেন কোথায় তথ্যের অভাব আছে এবং কোথায় অন্য পণ্ডিতরা ভিন্নমত পোষণ করেন। নিজের সিদ্ধান্তকে তিনি চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং একটি যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করেন। এমনকি যেসব পণ্ডিত মনে করেন সরস্বতী নদীর কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তাঁদের যুক্তিও তিনি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, একজন সংকীর্ণমনা প্রচারক কখনো বিরোধী মতকে এভাবে স্থান দেন না।

যে বিতর্ক সমালোচকরা এড়িয়ে যেতে চান

সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো, দানিনো কেবল প্রাচীন ভারতের প্রশংসাই করেন না, বরং ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা কেন নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেয় না, তারও কড়া সমালোচনা করেন। ২০১৫ সালে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন যে, ভারতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসের জন্য আলাদা কোনো বিভাগ নেই। আর্যভট্ট বা ভাস্করাচার্যের মতো গণিতবিদদের নিয়ে সবচেয়ে ভালো অনলাইন রিসোর্সটি চালায় স্কটল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো ভারতীয় প্রতিষ্ঠান নয়।

তাঁর যুক্তি, ভারতের মূলধারার ইতিহাস চর্চায় দেশের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক সাফল্য—যেমন ব্রহ্মগুপ্ত বা সুশ্রুতের অবদান—যখন উপেক্ষিত হয়, তখনই সেই শূন্যস্থানে প্রাচীন বিমান বা বৈদিক পারমাণবিক অস্ত্রের মতো কাল্পনিক দাবিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাঁর সমাধান সুনির্দিষ্ট—সত্যিকারের সাফল্যগুলো নথিভুক্ত করো এবং সঠিকভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করো, তাহলেই মিথ্যার জায়গা থাকবে না।

শিক্ষামহলের একটি বড় অংশের প্রশ্ন, জার্মান ও ফরাসি বৈজ্ঞানিক মিশনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে গবেষক কাজ করেন, যিনি বিরোধী মতকে সম্মান দেন এবং দেশের প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নিয়ে সরব হন তাঁকে কি স্রেফ ‘মতাদর্শী’ বলা যায়? একইভাবে, পাঠ্যবইয়ে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা কি শিক্ষার্থীদের সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পথ, নাকি বিচারবিভাগকে খাটো করার প্রয়াস—এই বিতর্ক এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।