বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব অর্থনীতি কখনও কখনও এমন এক সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলে থাকে, যা ছিঁড়ে গেলে তার অভিঘাত মহাদেশ পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ৬ মার্চ কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি যখন সতর্ক করে বলেছিলেন—“এটি বিশ্বের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে”—তখন তাঁর কথায় অতিরঞ্জনের ছাপ ছিল না। কয়েক দিন আগেই কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা কাতারএনার্জি তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক উত্তেজনা। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে কাতার গ্যাস উত্তোলন বা প্রক্রিয়াকরণ করলেও তা জাহাজে করে বাইরে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় কাতারএনার্জি তাদের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলিতে ফোর্স মাজ্যর ঘোষণা করেছে—অর্থাৎ এমন এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। এলএনজির দাম দ্রুত বাড়ছে। কারণ এই গ্যাসই পৃথিবীর অসংখ্য দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ঘর গরম রাখা এবং সার তৈরির মতো শিল্পকারখানার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। ফলে বিশ্বের নানা দেশের সরকার এবং শিল্পক্ষেত্র—দু’দিকেই এখন শুরু হয়েছে বিকল্প ব্যবস্থার মরিয়া খোঁজ।
কাতারের এই বিরতি বিশ্ব অর্থনীতিকে ঠিক কতটা নিচে নামিয়ে দেবে, তা নির্ভর করছে চারটি কঠিন প্রশ্নের উপর। প্রথমত, এই বন্ধ কত দিন স্থায়ী হবে? দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রপ্তানি পুনরায় শুরু হতে কত সময় লাগবে? তৃতীয়ত, ততদিন পর্যন্ত দেশগুলো কি তাদের মজুত গ্যাস দিয়ে টিকে থাকতে পারবে? এবং চতুর্থত, কাতারের ঘাটতি অন্য কোনো দেশের এলএনজি দিয়ে পূরণ করা আদৌ সম্ভব কি না।
এই চারটির মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত প্রথম প্রশ্নটি, যুদ্ধ কতদিন চলবে। কারণ এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে তিনজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের উপর—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।
৯ মার্চ ট্রাম্প একদিকে বলেছিলেন যে ইরান যুদ্ধ “খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে”, আবার একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে আমেরিকা “আরও বড় পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত”। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ইরানের সেই সামরিক ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা, যার মাধ্যমে ইজরায়েলকে হুমকি দেওয়া যায়। আর মোজতবা খামেনির অবস্থানও অত্যন্ত দৃঢ়—যুদ্ধের শুরুতেই তাঁর বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি ইজরায়েলি হামলায় নিহত হন। ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ইরান ঘোষণা করেছে, যুদ্ধের সমাপ্তি “তাদেরই হাতে নির্ধারিত হবে”।
ফলে সংঘর্ষ এবং কাতারের এলএনজি রপ্তানি বন্ধ—এই দুইয়ের স্থায়িত্ব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে। এই সম্ভাবনাগুলির কোনোটিই সুখকর নয়। জ্বালানি বিশ্লেষণ সংস্থা রিস্ট্যাড এনার্জি-র হিসাব অনুযায়ী, যদি অবকাঠামোর বড় ক্ষতি না হয়ে থাকে এবং মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে রপ্তানি আবার শুরু হয়, তাহলেও ২০২৬ সালে বিশ্ব এলএনজি উৎপাদন প্রায় ৪.৩ শতাংশ কমে যেতে পারে। আর যদি এই বন্ধ এক মাস স্থায়ী হয়, তাহলে সেই ক্ষতি ১৪ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়—ধরা যাক এক বছর—অবরুদ্ধ থাকে, তাহলে অতিরিক্ত উৎপাদনের চেষ্টা সত্ত্বেও বিশ্ব এলএনজি উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। অথচ একই সময়ে ২০২৬ সালে এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা প্রায় ৮ শতাংশ বাড়বে বলে আগে থেকেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
রপ্তানি আবার শুরু হলেও তা রাতারাতি স্বাভাবিক হবে না। প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন তুলনামূলক সহজ—অনেকটা কল খোলার মতো। কিন্তু এলএনজি তৈরি করা অনেক বেশি জটিল প্রক্রিয়া। গ্যাসকে তরল বানাতে তাকে শূন্যের নিচে প্রায় ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা করতে হয়। এই জটিল প্রক্রিয়ার কারণে কাতারএনার্জি সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মতো উৎপাদনই মজুত করে রাখতে পারে।
এছাড়া এলএনজি ট্যাঙ্কার এবং তরলীকরণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানোর জন্যই তৈরি। এগুলো একবার বন্ধ হয়ে গেলে আবার চালু করতে হলে ধীরে ধীরে পুনরায় ঠান্ডা করতে হয়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যান-সোফি করবো ব্যাখ্যা করেছেন যে, পুরো ব্যবস্থা একসঙ্গে চালু করা যায় না, ধাপে ধাপে প্রতিটি যন্ত্র পুনরায় সক্রিয় করতে হয়। তাছাড়া কাতারের কাছে বহু ট্যাঙ্কার থাকলেও গ্যাস জাহাজে তোলার জন্য জেটির সংখ্যা খুব বেশি নয়।
ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি পুনরায় শুরু হলেও প্রথম এলএনজি কার্গো প্রস্তুত করতে সাধারণত প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। আর পুরো উৎপাদন ক্ষমতা ফিরে পেতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশ তাদের গ্যাসের মজুত ব্যবহার করবে কি না, তা নিয়ে হিসেব কষছে। তেলের ক্ষেত্রে যেমন কৌশলগত রিজার্ভ থাকে, গ্যাসের ক্ষেত্রে তেমন বৈশ্বিক ব্যবস্থা নেই। কিছু অঞ্চল যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ন্যূনতম গ্যাস মজুত রাখার নিয়ম করেছে। কিন্তু তবুও ইউরোপ পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
যদিও ইউরোপের এলএনজি আমদানির মাত্র ১৩ শতাংশ কাতার থেকে আসে, তবুও শীতকাল শেষে তাদের মজুত আগের তুলনায় কম। রিস্ট্যাড সতর্ক করেছে, যদি কাতারের সরবরাহ বন্ধ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে আগামী শীতের জন্য ইউরোপের গ্যাস মজুতের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তখন হয়তো গ্যাসের ব্যবহার কমাতে হবে, কয়লায় ফিরে যেতে হবে, অথবা রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করতে হবে—যা আগামী বছর পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা।
এশিয়ার অবস্থা আরও কঠিন। উপসাগরীয় অঞ্চলের গ্যাসের উপর তাদের নির্ভরতা বেশি এবং বিকল্পের সুযোগ কম। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে প্রায় ৫২ দিনের গ্যাস মজুত আছে। জাপানের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২০ দিন। আর তাইওয়ানের মজুত মাত্র ১১ দিন চলবে। এই সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগজনক তাইওয়ানের জন্য, কারণ বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি এলএনজির বড় ব্যবহারকারী।
ভারতের অবস্থা আরও ভঙ্গুর। মরগান স্ট্যানলি হিসেব করে দেখেছে, দেশের গ্যাস মজুত মাত্র পাঁচ বা ছয় দিনের মতো। ফলে বড় শিল্পকারখানাগুলি ইতিমধ্যে ব্যবহার কমাতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গেইল এবং ইন্ডিয়ান অয়েল গ্যাস ব্যবহারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কাটছাঁট করার চেষ্টা করছে বলে খবর। এমনকি একটি বড় শহরে গ্যাস দিয়ে দাহক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎসের সন্ধান শুরু হলেও বাস্তবতা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যখন ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাস আমদানি হঠাৎ কমে যায়, তখন আমেরিকার এলএনজি সেই ঘাটতি অনেকটা পূরণ করেছিল। কিন্তু তখন সংকট ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল, ফলে ইউরোপের কাছে প্রস্তুতির সময় ছিল নতুন অবকাঠামো তৈরি করা, চাহিদা কমানো এবং অন্য উৎস খুঁজে নেওয়ার জন্য।
এইবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জেপি মরগানের মতে, এবার আঘাতটি “হঠাৎ” এসেছে এবং বিকল্প সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত। কাতারের মতো বিশাল সরবরাহ ঘাটতি পূরণ করা “বাস্তবে সম্ভব নয়” বলেই তাদের মত।
বিশ্বের বেশিরভাগ এলএনজি রপ্তানিকারকই ইতিমধ্যে প্রায় পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদকরা প্রায় ৯০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। তারা সর্বোচ্চ উৎপাদন বাড়ালেও অতিরিক্ত ১০ মিলিয়ন টন সরবরাহ করতে পারবে যা বর্তমান ঘাটতির ৮৫ মিলিয়ন টনের তুলনায় খুবই সামান্য। আমেরিকার এলএনজি রপ্তানি স্থাপনাগুলিও প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষমতায় চলছে। নতুন প্রকল্প তৈরি হলেও সেগুলো এই সংকটের সময় দ্রুত চালু হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। টেক্সাসের বৃহৎ গোল্ডেন পাস প্রকল্প প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে বিলম্বিত হয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে পারে একমাত্র রাশিয়া। কিন্তু বাস্তবে সেই পথও রাজনৈতিকভাবে জটিল। ইউরোপকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে, পুরনো পাইপলাইন চালু করতে হবে এবং ইউক্রেনের ভূখণ্ড দিয়ে গ্যাস প্রবাহের অনুমতি দিতে হবে যা বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে। এমনকি রাশিয়ার নিষিদ্ধ “শ্যাডো ফ্লিট” এলএনজি জাহাজগুলির উপর আক্রমণও বন্ধ করতে হবে। ইউরোপ এবং ইউক্রেন—উভয়ের জন্যই এই সম্ভাবনা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
তবে সবাই সমানভাবে আতঙ্কিত নয়। আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের কর্মকর্তা মেল ইদ্রেওস মনে করিয়ে দেন, বিশ্বের অধিকাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আসলে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ হয়, এলএনজি হিসেবে নয়। তবু তিনি সতর্ক করে দেন, যত দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকবে, ততই জটিলতা বাড়বে।
আর মূল্য বিশ্লেষণ সংস্থা আর্গাস মিডিয়ার মার্টিন সিনিয়রের ভাষায়, বাস্তবতা খুব স্পষ্ট—যতদিন কাতারের এলএনজি বাজারে ফিরবে না, ততদিন চাহিদাকেই কমতে হবে। আর সেই আঘাত কতটা বড় হবে, তা নির্ভর করছে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং খামেনি—এই তিন নেতার মধ্যে সমঝোতা কত দ্রুত সম্ভব হয় তার উপর।