Home খবর যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র ও এআই: সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে ভুয়ো প্রচার

যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র ও এআই: সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে ভুয়ো প্রচার

0 comments 6 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে এক অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক তথ্যযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে একটি অস্পষ্ট ও দানাদার ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে—চোখ বাঁধা এক সারি কিশোরী মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আর তাদের সামনে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভিডিওটির মধ্যে একটি মেয়ের আতঙ্কিত কণ্ঠে জার্মান ভাষায় আর্তনাদ শোনা যায়। এরপর দৃশ্য কেটে যায়—ট্রাম্পসহ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিকে দেখা যায় প্রয়াত শিশু যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে।

“HDX News” নামে একটি অ্যাকাউন্ট দাবি করে—“এই ভিডিও ভুয়ো নয়। এই বিকৃতমনা পেডোফাইলরাই যুদ্ধ শুরু করেছে, যাতে এই বিষয়টি নিয়ে আর কেউ কথা না বলে।” কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টটি প্রায় ৬৮ লক্ষ বার দেখা হয়।

তবে তথ্যযুদ্ধ ও অনলাইন বিভ্রান্তি নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা দ্রুতই জানান—ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়ো। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি জাল ভিডিও, যার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রচার। তদন্তে আরও জানা যায়, ভিডিওটি যে অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে সেটি আসলে একটি বৃহত্তর প্রো-ইরান প্রচার নেটওয়ার্কের অংশ, যারা সামাজিক মাধ্যমে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ব্যবহার করে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা করছে।

গবেষকদের মতে, এই প্রচারের কৌশলও বেশ স্পষ্ট। আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত দুর্বল করার জন্য ইরানের রাষ্ট্র-সমর্থিত মিডিয়া একটি নির্দিষ্ট গল্প ছড়াতে চাইছে যে পশ্চিমা নেতৃত্ব আসলে তথাকথিত “এপস্টিন শ্রেণি” বা “এপস্টিন শাসনব্যবস্থা”-র অংশ, অর্থাৎ নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিকৃত। সাধারণত এই ধরনের প্রচার ইরানের বাইরের বিশ্বে খুব বেশি সাড়া পায় না। কিন্তু এবার গবেষকেরা দেখছেন, “সংবাদমাধ্যমের মতো দেখতে” কিছু সাধারণ নামের এক্স অ্যাকাউন্ট এই বার্তাগুলি ছড়িয়ে দিয়ে বৈশ্বিক দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের (ISD) মার্কিন গবেষণা ও নীতি বিভাগের পরিচালক ব্রেট শ্যাফার বলেন,  এপস্টিন-সম্পর্কিত বিষয়গুলি ইচ্ছাকৃতভাবে সামনে আনা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “এপস্টিন নিয়ে কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। মানুষ এপস্টিনের গল্প শুনতে আসে, কিন্তু তারপর তারা সেই সঙ্গে প্রচারও গ্রহণ করে।”

এই বিভ্রান্তিমূলক প্রচার শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে, যখন আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন এবং তার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় থেকেই সামাজিক মাধ্যমে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—বাস্তব যুদ্ধের ভিডিওর সঙ্গে মিশে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো মিসাইল হামলার দৃশ্য, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার নাটকীয় ফুটেজ বা বিস্ফোরণের দৃশ্য। পরে দেখা গেছে, এগুলোর বেশিরভাগই আসলে পুরনো যুদ্ধের ভিডিও, ভিডিও গেমের দৃশ্য, কিংবা সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত কল্পচিত্র।

আইএসডি-র গবেষকেরা খুঁজে পান, “HDX News” আসলে অন্তত ১৫টি বেনামী এক্স অ্যাকাউন্টের একটি নেটওয়ার্কের অংশ। এই অ্যাকাউন্টগুলো নিয়মিত এমন কনটেন্ট ছড়ায় যা ইরানের ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থার প্রচারকে সমর্থন করে এবং তারা পরস্পরের পোস্ট পুনরায় শেয়ার করে। একই নেটওয়ার্কের আরেকটি অ্যাকাউন্ট “GPX News” সেই একই ভুয়ো এপস্টিন ভিডিও পোস্ট করে, যা আবার ৪৭ লক্ষের বেশি বার দেখা হয়।

হোয়াইট হাউসও বিষয়টি নজরে নিয়েছে। মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, “আমরা জানি যে ইরানি শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাই আমরা বারবার সতর্ক করেছি যাতে ভুয়ো খবরের মাধ্যমে তাদের প্রচার অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে না পড়ে।”

ওয়াশিংটন পোস্ট এই অ্যাকাউন্টগুলির বিষয়ে প্রশ্ন তুললে এক্স পরে “HDX News” ও “GPX News” অ্যাকাউন্ট দুটিকে স্থগিত করে। তবে একই নেটওয়ার্কের আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট তখনও সক্রিয় ছিল।

শ্যাফারের মতে, এই অ্যাকাউন্টগুলো সরাসরি ইরান সরকারের হয়ে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে তাদের প্রচার যে স্পষ্টভাবে ইরানপন্থী তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

এই অ্যাকাউন্টগুলোর পোস্টে দেখা গেছে—মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ইরানের সফল হামলার উচ্ছ্বাসপূর্ণ দাবি, “ইরানের পাশে দাঁড়ান” ধরনের আহ্বান, এবং এমন ইঙ্গিত যে রাশিয়া ও চীন ইরানকে সমর্থন করে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংঘাতে অংশ নিতে প্রস্তুত। আইএসডি যে ১৫টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে তার সবগুলোই গত দুই বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি আবার এক্স-এ যাচাইকৃত, অর্থাৎ তারা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে নীল টিক চিহ্ন ও বাড়তি দৃশ্যমানতার সুবিধা পাচ্ছে এবং পোস্ট থেকে আয় করার সুযোগও পাচ্ছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই একই অ্যাকাউন্টগুলোর অনেক পোস্টে স্পষ্ট ইহুদিবিদ্বেষী বা এমনকি নাৎসি-সমর্থনমূলক বার্তাও দেখা গেছে। “HDX News” একটি এআই-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করে যেখানে এক দাড়িওয়ালা ইহুদি ব্যক্তিকে ইসরায়েলের পতাকা হাতে আমেরিকান পতাকা-খচিত কবরের মাঠের মধ্যে নাচতে দেখা যায়। সেই ভিডিওটি এক হাজারের বেশি “লাইক” পায়। একই নেটওয়ার্কের আরেকটি অ্যাকাউন্ট “GPX Press” একটি বক্তৃতার ভিডিও পোস্ট করে অ্যাডলফ হিটলারের , এবং তার সঙ্গে লেখে—“আজ বিশ্ব সত্যিই বুঝতে পারছে কেন হিটলার ইহুদিদের হত্যা করেছিলেন।” পোস্টটি প্রায় ২৭ হাজার লাইক এবং ২৬ লক্ষ ভিউ পায়।

গত সপ্তাহে এক্স-এর পণ্য বিভাগের প্রধান নিকিতা বিয়ার ঘোষণা করেন যে ব্যবহারকারীরা যুদ্ধসংক্রান্ত এআই-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করবে কিন্তু তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবে না, তাদের ৯০ দিনের জন্য প্ল্যাটফর্মে আয় করার সুযোগ থেকে নিষিদ্ধ করা হবে। পুনরাবৃত্তি হলে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। কোম্পানি কমিউনিটি নোটসহ অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করে এই ধরনের কনটেন্ট শনাক্ত করার পরিকল্পনা করছে।

বিয়ার বলেন, “যুদ্ধের সময় মানুষের কাছে বাস্তব তথ্য পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এক্সকে যেন বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রাখা যায়, সেই জন্য আমরা আমাদের নীতি ও প্রযুক্তি উন্নত করতে থাকব।” তবে এই প্রো-ইরান অ্যাকাউন্টগুলো নতুন নীতি ভঙ্গ করার কারণে নাকি পুরনো নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য স্থগিত হয়েছে—তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ইহুদিবিদ্বেষী পোস্টের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নাগরিক অধিকার সংগঠন অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ (ADL) বলছে, এই পোস্টগুলোর অনেকই এপস্টিন—যিনি নিজেও ইহুদি ছিলেন—তাকে ঘিরে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সেই গল্পকে জুড়ে দিতে চেষ্টা করছে।

ফলে যুদ্ধের পাশাপাশি এখন আরেকটি লড়াইও চলছে—তথ্য ও বিভ্রান্তির লড়াই, যেখানে বাস্তব ঘটনাকে ছাপিয়ে ভুয়ো ছবি, এআই-নির্মিত ভিডিও এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দ্রুত জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles