বাংলাস্ফিয়ার: লন্ডনে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা মেলা ‘লন্ডন বুক ফেয়ার’-এ মঙ্গলবার এক অভিনব প্রতিবাদের সাক্ষী রইল সাহিত্যজগৎ। ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরো, ঐতিহাসিক কাহিনির লেখক ফিলিপা গ্রেগরি এবং জনপ্রিয় রহস্য-উপন্যাসিক রিচার্ড ওসমান-সহ প্রায় ১০ হাজার লেখক মিলে প্রকাশ করেছেন একটি প্রতীকী বই—‘ডোন্ট স্টিল দিস বুক’। বইটির বিশেষত্ব হল, এতে কোনো গল্প, প্রবন্ধ বা অধ্যায় নেই; রয়েছে শুধু অংশগ্রহণকারী লেখকদের নামের দীর্ঘ তালিকা।
এই বই আসলে একটি প্রতিবাদপত্রের মতো। অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থাগুলি লেখকদের লেখা অনুমতি বা পারিশ্রমিক ছাড়াই ব্যবহার করে তাদের মডেল ট্রেইন করছে। এই ক্ষোভ থেকেই লেখকেরা এই প্রতীকী “ফাঁকা বই” প্রকাশ করেছেন, যার কপি মেলার দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। ঘটনাটি ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটিশ সরকার কপিরাইট আইনে সম্ভাব্য পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ১৮ মার্চের মধ্যে সেই রিপোর্ট সংসদে জমা দেওয়ার কথা।
বইটির উদ্যোক্তা সুরকার ও কপিরাইট অধিকার আন্দোলনের কর্মী এড নিউটন-রেক্স জানান, বর্তমান AI শিল্প অনেকাংশেই এমন লেখা ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে, যা লেখকদের অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহ করা হয়েছে। তাঁর মতে, এটি কোনো নিরীহ ঘটনা নয়। জেনারেটিভ AI ঠিক সেই মানুষদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নামছে, যাদের কাজ থেকে সে শিখেছে। এতে লেখকদের জীবিকা সরাসরি বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন আরও বহু পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ‘স্লো হর্সেস’-এর লেখক মিক হেরন, আইরিশ ঔপন্যাসিক মেরিয়ান কিজ, ইতিহাসবিদ ডেভিড অলুসোগা এবং ‘নটস অ্যান্ড ক্রসেস’-এর স্রষ্টা ম্যালোরি ব্ল্যাকম্যান। ব্ল্যাকম্যান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থাগুলি যদি লেখকদের বই ব্যবহার করে, তবে তার জন্য অর্থ প্রদান করা একেবারেই স্বাভাবিক ও ন্যায্য দাবি।
বইটির পেছনের প্রচ্ছদে লেখা রয়েছে সরাসরি বার্তা — এআই কোম্পানিগুলির সুবিধার জন্য বই চুরিকে বৈধতা দেওয়া চলবে না এবং ব্রিটিশ সরকারকে সৃজনশীল শিল্পের পাশে দাঁড়াতে হবে। বর্তমানে যে আইনি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে বলা হয়েছে — এআই সংস্থাগুলি কপিরাইট সুরক্ষিত লেখা ব্যবহার করতে পারবে, যদি না লেখক বিশেষভাবে আপত্তি জানান। এই ‘অপ্ট-আউট’ ব্যবস্থাই শিল্পী ও লেখকমহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিখ্যাত সংগীতশিল্পী এলটন জনও এই সম্ভাব্য আইন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।
এআই প্রযুক্তি বিশেষত চ্যাটবট ও ছবি তৈরির সফটওয়্যার নির্মাণে বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্রয়োজন হয়, যার বড় অংশই সংগ্রহ করা হয় ইন্টারনেটের উন্মুক্ত ওয়েব থেকে। সেখানে থাকা অসংখ্য কপিরাইট-সুরক্ষিত বই ও লেখা ব্যবহার নিয়েই বিশ্বজুড়ে লেখক, শিল্পী ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে আইনি লড়াই ক্রমশ বাড়ছে। গত বছর এআই সংস্থা অ্যানথ্রপিক লেখকদের দায়ের করা একটি মামলার নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার দিতে রাজি হয়েছিল যা এই বিতর্কের ব্যাপকতাকেই স্পষ্ট করে।
এদিকে প্রকাশনা শিল্পও বিকল্প পথের সন্ধান করছে। শিল্পসংগঠন পাবলিশার্স লাইসেন্সিং সার্ভিসেস একটি সমষ্টিগত লাইসেন্সিং ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে এআই সংস্থাগুলি আইনসম্মত উপায়ে বই ব্যবহার করতে পারবে এবং লেখকেরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, তারা এমন একটি কপিরাইট কাঠামো তৈরি করতে চায়, যা একদিকে মানবসৃষ্ট সৃজনশীলতাকেকে সুরক্ষা দেবে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পথও রুদ্ধ করবে না।
তবে লেখকদের এই ‘ফাঁকা বই’ একটি স্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছে — এআই যুগে সৃজনশীলতার অধিকার রক্ষার লড়াই শুরু হয়ে গেছে, এবং লেখকেরা এ লড়াইয়ে পিছু হটতে রাজি নন।