Home খবরবড় খবর “রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি” – রায় সুপ্রিম কোর্টের

“রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি” – রায় সুপ্রিম কোর্টের

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক গভীর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্নকে সামনে এনে বুধবার একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ের বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে এক রোগীর ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া অর্থাৎ জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে আবারও স্পষ্ট করা হয়েছে যে “মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার” সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

এই সিদ্ধান্তটি দেন বিচারপতি জাস্টিস জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি জাস্টিস কেভি বিশ্বনাথন -এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। মামলায় উঠে আসে ৩২ বছর বয়সী হরিশ রানা নামের এক তরুণের ঘটনা, যিনি গত ১৩ বছর ধরে অপরিবর্তনীয় পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট (Persistent Vegetative State)-এ সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় শয্যাশায়ী।

আদালতের নথি অনুযায়ী, একসময় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা এই তরুণের জীবন বদলে যায় এক দুর্ঘটনায়। নিজের পেয়িং গেস্ট আবাসনের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে তিনি মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পান। সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁর শরীর সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত—শতভাগ কোয়াড্রিপ্লেজিয়ায় আক্রান্ত এবং তিনি আর কখনও সচেতন অবস্থায় ফিরে আসেননি। চিকিৎসকদের ভাষায়, তিনি এমন এক অবস্থায় আছেন যেখানে জীবনের সমস্ত স্বাভাবিক কার্যকলাপ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে; কেবল চিকিৎসাগত সহায়তায় শরীরের জৈবিক অস্তিত্ব বজায় রাখা হচ্ছে।

গত ১৩ বছর ধরে তাঁর জীবন টিকে আছে কৃত্রিমভাবে দেওয়া পুষ্টির ওপর। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় ক্লিনিক্যালি অ্যাডমিনিস্টার্ড নিউট্রিশন (CAN)। শরীরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বসানো একটি PEG টিউব-এর মাধ্যমে তাঁকে এই পুষ্টি সরবরাহ করা হচ্ছে।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা চললেও রোগীর অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং এই চিকিৎসা কেবল তাঁর জৈবিক অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত করছে; সুস্থতার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।

এই পরিস্থিতিতে হরিশ রানার বাবা আদালতের দ্বারস্থ হন। তিনি আবেদন করেন, তাঁর ছেলের উপর চলতে থাকা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হোক। তাঁর বক্তব্য, যে জীবন আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, তাকে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার মধ্যে মানবিকতার কোনো অর্থ নেই।

বিচারপতি পারদিওয়ালা তাঁর পর্যবেক্ষণে লেখেন, “হরিশ রানা একসময় এক তরুণ, উজ্জ্বল ছেলে ছিল। একটি দুর্ঘটনা তার জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। গত ১৩ বছরে তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।”

আদালত আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক স্পষ্ট করেছে—ক্লিনিক্যালি অ্যাডমিনিস্টার্ড নিউট্রিশনও একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। ফলে অন্যান্য চিকিৎসার মতো এটিও প্রয়োজন হলে প্রত্যাহার করা যেতে পারে, যদি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বোর্ড মনে করে যে তা রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থে নয়।

এই মামলায় দুটি স্বাধীন চিকিৎসক বোর্ড—প্রাইমারি মেডিক্যাল বোর্ড এবং সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ড—রোগীর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তাদের মতে, রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য এবং কৃত্রিমভাবে পুষ্টি সরবরাহ বন্ধ করাই তাঁর স্বার্থে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।

আদালত জানায়, সাধারণত এই দুই বোর্ড একমত হয়ে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হয় না। তবে দেশের ইতিহাসে এই নির্দেশিকার প্রথম বাস্তব প্রয়োগ হওয়ায় আদালত বিষয়টি নিজেই বিবেচনা করেছে।

চূড়ান্ত নির্দেশে আদালত জানায়, রোগীর উপর চলমান সমস্ত চিকিৎসা যার মধ্যে CAN-ও রয়েছে, প্রত্যাহার করা যেতে পারে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় ৩০ দিনের পুনর্বিবেচনার সময়সীমা থাকে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে আদালত সেই সময়সীমা মুকুব করেছে।

একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে রোগীকে অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব্ মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর প্যালিয়েটিভ কেয়ার কেন্দ্রে ভর্তি করা হবে। সেখানে নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধাপে ধাপে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা প্রত্যাহার করা হবে। রোগীকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের সমস্ত ব্যবস্থা AIIMS করবে।

আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এই প্রক্রিয়া এমনভাবে সম্পন্ন করতে হবে যাতে রোগীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনকভাবে মৃত্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

রায়ে আরও কিছু প্রশাসনিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের সব হাই কোর্টকে বলা হয়েছে তারা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশ দেবে, যাতে হাসপাতাল থেকে আসা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের নোটিশ গ্রহণ করা যায়, যখন দুটি চিকিৎসক বোর্ড সেই সিদ্ধান্তে একমত হয়।

এছাড়া কেন্দ্র সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দেশের প্রতিটি জেলায় চিফ মেডিক্যাল অফিসারদের মাধ্যমে নিবন্ধিত চিকিৎসকদের একটি প্যানেল তৈরি করতে, যেখান থেকে প্রয়োজনে সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা যাবে।

আদালত একই সঙ্গে কেন্দ্র সরকারকে এই বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে স্পষ্ট আইনি কাঠামো থাকে।

এই রায়ের ভিত্তি ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক মামলা Common Cause v. Union of India। সেই সময় একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ ঘোষণা করেছিল যে “মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার” সংবিধানের অধীনে মৌলিক অধিকারের অংশ এবং প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করেছিল। পরে ২০২৩ সালে সেই নির্দেশিকায় কিছু সংশোধন আনা হয়।

হরিশ রানার মামলাটি তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বেদনার ঘটনা নয়; এটি ভারতের আইনি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত, যেখানে আইন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবিকতার জটিল প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে।

রায়ের শেষে বিচারপতি পারদিওয়ালা হরিশের বাবা-মায়ের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানান। তিনি লেখেন, গত ১৩ বছরে তাঁরা কখনও তাঁদের ছেলেকে একা ছেড়ে যাননি।

“কাউকে ভালোবাসার মানে হলো—অন্ধকারতম সময়েও তার পাশে থাকা।”

এই কথাগুলো শুধু একটি আদালতের পর্যবেক্ষণ নয়; বরং এক গভীর মানবিক সত্যের প্রতিধ্বনি—যেখানে জীবন, মৃত্যু এবং ভালোবাসা এক জটিল অথচ মর্মস্পর্শী সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে থাকে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles