তবু নিজের সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দনের সীমা জানা ব্যায়াম পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কম তীব্রতার ব্যায়াম—যাকে বলা হয় “লো জোন”, যেখানে হৃদস্পন্দন থাকে সর্বোচ্চ সীমার প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত, সেগুলি শরীরের এরোবিক ক্ষমতা বাড়ায়, অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা উন্নত করে। অন্যদিকে, আরও তীব্র ব্যায়াম শরীরের অ্যানারোবিক ফিটনেস বা স্বল্পসময়ের উচ্চ শক্তি উৎপাদনের সক্ষমতাকে প্রশিক্ষিত করে।

বিশ্রামের সময়ের হৃদস্পন্দন নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও, সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দনের সীমা বদলানোর ক্ষমতা মানুষের খুবই সীমিত। ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়তে থাকলে হৃদস্পন্দনও বাড়ে, যাতে কর্মরত পেশিগুলিতে আরও বেশি অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এই বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। যখন হৃদস্পন্দনের মধ্যবর্তী সময় এতটাই কমে যায় যে হৃদপিণ্ডের ভেন্ট্রিকলগুলো পরবর্তী সংকোচনের আগে পুরোপুরি রক্তে পূর্ণ হতে পারে না, তখন প্রতিটি স্পন্দনের সঙ্গে কম রক্ত পাম্প হয়।

এই সর্বোচ্চ সীমাটি নির্ধারণ করে হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক পেসমেকার—সিনোএট্রিয়াল নোড। এই অংশের কোষগুলো বৈদ্যুতিক সংকেত সৃষ্টি করে হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু তারা প্রতি মিনিটে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি সংকেত তৈরি করতে পারে না। ফলে হৃদস্পন্দনেরও একটি চূড়ান্ত সীমা থেকে যায়।

বাস্তবে অধিকাংশ মানুষই তাদের প্রকৃত সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দন জানেন না। পেশাদার ক্রীড়াবিদদের সীমা মাপার আলাদা ব্যবস্থা আছে—চিকিৎসকের নজরদারিতে তাদের শরীরকে একেবারে ক্লান্তির শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই, তাই বয়সভিত্তিক সূত্রই ভরসা। বয়স বাড়লে সিনোএট্রিয়াল নোডের বৈদ্যুতিক সক্রিয়তা কমতে থাকে বলে গবেষণায় দেখা গেছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমে হৃদস্পন্দনের সর্বোচ্চ সীমাও।

“২২০ থেকে বয়স বাদ”—এই সূত্রটি ছিল বয়স ও সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দনের সম্পর্ক নির্ধারণের প্রথম প্রচেষ্টা,সূত্রটির জন্ম ১৯৭১ সালের একটি গবেষণাপত্রে। চেক প্রজাতন্ত্রের জান এভানজেলিস্তা পুরকিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়াম-শারীরবিদ্যা ও জৈবরসায়নের অধ্যাপক রবার্ট রোবার্গস জানাচ্ছেন, আধুনিক মানদণ্ডে সেই গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। মূল গবেষণায় বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য একত্র করা হয়েছিল, কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন বা ব্যায়াম পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে কঠোর কোনো মানদণ্ড ছিল না। এমনকি সূত্রটিও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত মডেল দিয়ে তৈরি হয়নি; বরং গবেষকেরা চোখের আন্দাজে একটি সরল রেখা এঁকে সেই সমীকরণটি দাঁড় করিয়েছিলেন। তবু এই দুর্বল ভিত্তি সত্ত্বেও সূত্রটি ব্যায়ামবিজ্ঞানের একপ্রকার অটল সত্যে পরিণত হয়ে যায়।

পরবর্তী কয়েক দশকে আরও কঠোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নতুন গবেষণাগুলি দেখায় যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দনের যে হ্রাস ঘটে, তা আগের সূত্রে ধারণার তুলনায় অনেক ধীর। বহুল উদ্ধৃত বিকল্প হলো সূত্র তানাকা সমীকরণ, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে Journal of the American College of Cardiology-তে: ২০৮ – (০.৭ × বয়স)। এই হিসেবে পঞ্চাশ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তির সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দন দাঁড়ায় প্রায় ১৭৩।

তবে এই নতুন পদ্ধতিগুলিও মানুষের মধ্যে থাকা বিশাল ব্যক্তিগত পার্থক্য পুরোপুরি ধরতে পারে না। ২০২৫ সালের অক্টোবরে PLOS ONE-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৩০ জন মানুষের ক্ষেত্রে সাতটি ভিন্ন সূত্রের অনুমানকে বাস্তব মাপজোকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পূর্বাভাস প্রতি মিনিটে প্রায় ২০টি স্পন্দন পর্যন্ত এদিক-ওদিক ভুল হতে পারে।

এই মাত্রার ত্রুটির অর্থ হলো—একজন পঞ্চাশ বছর বয়সীর জন্য যা মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম, সেটিই অন্য আরেকজনের ক্ষেত্রে উচ্চ তীব্রতার হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে শৌখিন ক্রীড়াবিদ বা সাধারণ ব্যায়ামকারীদের কী করা উচিত? অধ্যাপক রোবার্গসের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিততা ও ধারাবাহিকতা। একটি পদ্ধতি বেছে নিন এবং সেটির উপরই স্থির থাকুন। তাতে অন্তত আপনি বুঝতে পারবেন আপনার নির্বাচিত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি কাজ করছে কি না—এবং প্রয়োজনে সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারবেন।