বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিদেশনীতির মহারথীদের জন্য এ যেন “আগেই বলেছিলাম” ধরনের এক মুহূর্ত হওয়ার কথা ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি এখন স্পষ্টভাবেই অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে উদ্যত। তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশগুলি তাই ক্রমশ ভীত ও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। কোনও আইন বা আন্তর্জাতিক চুক্তিই যেন নগ্ন শক্তির এই প্রয়োগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
দিল্লির বইয়ে ঠাসা অধ্যয়নকক্ষ আর গাছঘেরা সরকারি আবাসে বসে ভারতের কূটনীতির ব্রাহ্মণেরা বহুদিন ধরেই এমন এক পৃথিবীর আগমন কল্পনা করেছিলেন। বিশৃঙ্খলাপূর্ণ এক বিশ্বব্যবস্থার জন্য ভারত অনেক আগেই নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিল, কখনও কখনও তারা যেন সেই পরিস্থিতিকে স্বাগতই জানিয়েছিল। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং পরে গত বছর আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তখন ভারতীয় কর্মকর্তারা পশ্চিমী মিত্রদের বিদ্রূপ করেছিলেন—তারা ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ও “আমেরিকা ফার্স্ট” স্লোগান নিয়ে যে হতাশা প্রকাশ করছিল, তা নিয়ে। ভারতীয়দের ভাষায়, ট্রাম্প আসলে আমেরিকার প্রকৃত ও চিরন্তন মুখ, শুধু মুখোশটা খুলে গেছে।
তার সঙ্গে সঙ্গেই ভারত ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণের জন্য তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়াকে ‘অপদার্থ’ বা ‘অপরাধী রাষ্ট্র’ বলে নিন্দা জানাতেও অস্বীকার করেছিল। বড় শক্তিগুলো সবসময়ই নির্মম—ভারতের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকেরা বিদেশি অতিথিদের এমনটাই বলতেন—আর তথাকথিত উদারনৈতিক “নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা” আসলে এক ধরনের ভণ্ডামি। পশ্চিমি গণতন্ত্রগুলো হয়তো সেই পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার জন্য শোক করবে, যে ব্যবস্থাকে তারা একসময় নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ভারতের সামনে ছিল বাস্তব স্বার্থের হিসাব, যে চুক্তিগুলো তাকে করতে হবে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এখনও সেই একই বার্তা প্রচার করে চলেছেন। ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার খবর দিল্লিতে ৫ থেকে ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত সরকার-সমর্থিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন রায়সিনা ডায়ালগের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে জয়শঙ্কর বিশ্বব্যবস্থার “শৃঙ্খলা থেকে বিশৃঙ্খলায়” সরে যাওয়ার ঘটনাকে বেশ শান্তভাবেই বর্ণনা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ১৯৪৫ সালের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা ছিল “পশ্চিমিদের দ্বারা, পশ্চিমিদের জন্য, পশ্চিমিদের হতেই ” নির্মিত এক শৃঙ্খলা। সেই নিয়ম টিকেছিল মাত্র ৭০ বছর, ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসের তুলনায় যা মাত্র এক শতাংশ। যদি সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এতে গোলার্ধের দক্ষিণের দেশগুলির জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “জীবন এগিয়ে চলে।”
কিন্তু দুঃখের বিষয়, দিল্লির বিদেশ দফতর ও নিরাপত্তা মহলই জয়শঙ্করের এই নির্লিপ্ত আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। তাঁদের একজন প্রভাবশালী ভারতীয় মন্তব্য করেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেন সাহস জোগাতে গিয়ে নিজেই নিজেকে বাঁশি শুনিয়ে যাচ্ছেন; বাস্তবে এটি অপমানের সময়। ইরানের সঙ্ঘাতের কারণে যদি জাহাজগুলো নিরাপদে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে না পারে এবং কাতারের মতো বড় সরবরাহকারী যদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রফতানি স্থগিত রাখে, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভারত গুরুতর জ্বালানি ঙ্কটে পড়তে বাধ্য।
রাইসিনা ডায়ালগ চলাকালেই ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করে যে তারা একটি ছাড়পত্র দিচ্ছে যার মূলকথা ভারত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে। কিন্তু এতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বদলে দিল্লির নীতিনির্ধারক মহলে উল্টো গুঞ্জন শোনা গিয়েছে । অনেকের মনে হয়েছে যেন তাদের প্রভু ৩০ দিনের জন্য একটি ‘চিরকূট’ দিয়ে অনুমতি দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে যখন মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডিউ তাঁর বক্তৃতায় বলেন “চিনের ক্ষেত্রে আমরা ২০ বছর আগে যে ভুল করেছিলাম, ভারতের ক্ষেত্রে তা আর করব না। তখন আমরা বলেছিলাম,‘আপনাদের সব বাজার খুলে দিচ্ছি, উন্নতি করুন।’ তারপর দেখি আপনারাই আমাদের বহু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে হারিয়ে দিচ্ছেন।”
এ সময় আরও কয়েকজন উদ্বেগ প্রকাশ করেন অন্য একটি ঘটনাকে ঘিরে। শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরানের সেই ফ্রিগেট দখল করার চেয়ে ডুবিয়ে দেওয়া নাকি “আরও মজার” ছিল। এই ঘটনাকে অনেকেই ভারতের প্রতি অপমান হিসেবে দেখেছেন কারণ ওই ইরানি জাহাজটিকে ভারত ঠিক তার আগে একটি নৌ-মহড়ায় আতিথ্য দিয়েছিল। সেই উদ্বেগ ধীরে ধীরে ক্ষোভে পরিণত হয়। কারণ নরেন্দ্র মোদির সরকার এই ঘটনার নিন্দা করেনি এবং সামগ্রিকভাবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেশ নীরব থেকেছে।
এর ব্যাখ্যা হিসেবে অনেকেই বলেন—ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভয়। গত বছর তাঁর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর ভারত–আমেরিকা সম্পর্ক বেশ খারাপ হয়ে পড়েছিল। এক অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষায়, ট্রাম্প ফিরে আসার সময় ভারতের সরকারের “অহংকার আর দম্ভ” পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। ২০২৫ সালে ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন এবং ভারত–পাকিস্তানের একটি সংক্ষিপ্ত সঙ্ঘর্ষের সময় তিনি যেন পাকিস্তানের দিকেই ঝুঁকে পড়েছিলেন। উপরন্তু চিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার প্রশ্নে ট্রাম্পের আগ্রহ ভারতকে আরও আশাহত করে কেননা নয়াদিল্লি মনে করেছিল যে তারা আমেরিকার কাছে চীনবিরোধী এক গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হয়ে উঠবে। তবুও দিল্লির অভিজাত মহলে একটি ঐকমত্য আছে—ভারতের আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দরকার, কারণ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং উন্নতমানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনা নেই।
ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রায়ই নিজেদের দক্ষতার কথা বলেন—কীভাবে তারা একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে: আমেরিকা, রাশিয়া, ইজরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলো। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্য এবং ইজরায়েলের গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা সত্ত্বেও ভারত ইরানের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।এর পিছনে আছে পাকিস্তানের প্রতি এক যৌথ বিরূপতা এবং আফগানিস্তানে পৌঁছানোর জন্য ভারতের একটি স্থলপথের প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু দিল্লির অনেক প্রভাবশালী মানুষই প্রশ্ন তুলছেন—এই ভারসাম্য রক্ষার কৌশল কি সত্যিই ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ায়, যেমন জয়শঙ্কর ও তাঁর সমর্থকেরা দাবি করেন? নাকি ভিতরের লোকজনের ভাষায়, দেশটি বরং বিপজ্জনকভাবে বহু শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যকেই বিপন্ন করবে না, বিপদে ফেলবে প্রায় ৯৫ লক্ষ ভারতীয়কেও, যারা সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন আরব দেশে বাস ও কাজ করেন এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ দেশে পাঠান। পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘ জ্বালানি অবরোধ হলে চীন আরও বেশি রুশ তেল কিনতে শুরু করতে পারে। এতে যদি রাশিয়ার ওপর চীনের নির্ভরতা আরও বাড়ে, তবে সেটিও ভারতের পক্ষে আদৌ সুখবর হবেনা। কারণ ভারত একদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্কও উত্তেজনাপূর্ণ, যার মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণঘাতী সীমান্ত সঙ্ঘর্ষ পর্যন্ত ঘটেছে।
ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আরেকভাবে চীনের প্রভাব বাড়তে পারে। যদি ভারত জ্বালানির ক্ষেত্রে আরও স্বনির্ভর হতে চায়, তবে তাকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে বড়সড় উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে এবং কম খরচে সৌরপ্যানেল, বায়ু টারবাইন ও ব্যাটারি সরবরাহ করার ক্ষমতা কার্যত একমাত্র চীনেরই আছে—নির্ভরতার ঝুঁকি সত্ত্বেও।
সব মিলিয়ে, অস্থিরতায় ভরা এক বিশ্ব ভারতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এক অর্থে এটি ভারতের কৃতিত্বও—কারণ দেশটি নিজেকে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করছে, আর বিশৃঙ্খলা সেই লক্ষ্যকে ভেস্তে দিতে পারে। কিন্তু আত্মসম্মান ও রাজনৈতিক প্রচারের কারণে ভারতীয় নেতারা প্রকাশ্যে এ কথা স্বীকার করতে পারেন না।