Home খবরবড় খবর ইরান যুদ্ধে জলের মতো ডলার পোড়াচ্ছে পেন্টাগন

ইরান যুদ্ধে জলের মতো ডলার পোড়াচ্ছে পেন্টাগন

0 comments 25 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে—মার্কিন প্রশাসনের তিনজন কর্মকর্তার দেওয়া এই তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে কংগ্রেসে। কারণ, এত দ্রুত গতিতে যুদ্ধ পরিচালনার ফলে আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত কত দ্রুত কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছে।

সোমবার কংগ্রেসকে জানানো এই হিসেব আরও একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে ইরান অভিযানের কারণে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে বলে যে আশঙ্কা বহু আইনপ্রণেতা প্রকাশ করেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সেই উদ্বেগকে এতদিন যে ভাবে উড়িয়ে দিয়েছে, তা কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল।

কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ট্রাম্প প্রশাসন খুব শিগগিরই কংগ্রেসে একটি অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব পাঠাতে পারে। এর পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই প্রস্তাবের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক বিরোধিতার—বিশেষত ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে, যারা শুরু থেকেই প্রশাসনকে ইরানে আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছিলেন, যদিও সেই প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।

দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট যে সময়, যে স্থান এবং যে সময়সীমা নির্ধারণ করবেন, সেই অনুযায়ী যেকোনো সামরিক মিশন পরিচালনার জন্য প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে।”

যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছিলেন, অভিযানটি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। কিন্তু সোমবার CBS News-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনীর বিপুল ক্ষতির কারণে অপারেশনটি এখন “প্রায় সম্পূর্ণ” হয়ে এসেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জানান, সামরিক অভিযান এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। শুরুতে যে উচ্চমূল্যের নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত অস্ত্র ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা ছিল, তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে। এর পরিবর্তে আরও বেশি ব্যবহার করা হবে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য লেজার-নির্দেশিত বোমা। আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের আকাশসীমায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার পর এখন স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলেন, ৫.৬ বিলিয়ন ডলারের যে ব্যয়ের হিসাব সামনে এসেছে, তা মূলত সেই সময়কার যখন এখনও এই কৌশলগত পরিবর্তন শুরু হয়নি। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা ওই কর্মকর্তারা অবশ্য জানাননি, ঠিক কতটি বা কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

এর আগে দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী শত শত নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করেছে—যার মধ্যে রয়েছে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং টোমাহক ক্রুজ মিসাইল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানে এখন পর্যন্ত ৫,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে ব্যবহার হয়েছে ২,০০০-এর বেশি গোলাবারুদ।

ওয়াশিংটনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, দীর্ঘপাল্লার অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্র থেকে সরে এসে লেজার-নির্দেশিত বোমার ব্যবহার বাড়ানো হলে প্রতিটি হামলার খরচ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। তাঁর মতে, “যেখানে একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হয়, সেখানে কিছু ক্ষেত্রে লেজার-নির্দেশিত বোমা ব্যবহার করলে সেই খরচ এক লাখ ডলারেরও নিচে নেমে আসতে পারে।”

তবে যুদ্ধের কারণে মার্কিন সেনাবাহিনী শুধু অস্ত্র খরচই করছে না, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও সামরিক সম্পদ সরিয়ে আনছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই আইনপ্রণেতাদের আশঙ্কা ছিল—চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে পেন্টাগনের উন্নত অস্ত্রভাণ্ডার যথেষ্ট নাও হতে পারে।

দুই কর্মকর্তার মতে, পেন্টাগন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে একটি THAAD (Terminal High Altitude Area Defense) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েন থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশও স্থানান্তর করা হচ্ছে, যাতে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা যায়।

তবে কর্মকর্তাদের একজন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্রের তাৎক্ষণিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে নয়; বরং ইরান যদি হঠাৎ করে প্রতিশোধমূলক হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যদিও সংঘাত শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পর ইরানের পাল্টা হামলার হার কিছুটা কমে এসেছে।

ক্যানসিয়ানের সতর্ক মন্তব্য— “আপনি যত বেশি THAAD বা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবেন, তত বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এবং ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও।”

এই দুটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে গণ্য।

অভিযান শুরুর আগে জেনারেল কেইন ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন—ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে মার্কিন নির্ভুল অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করার ফলে ইতিমধ্যেই এই মজুত অনেকটা কমে গেছে, তার ওপর আরও অন্তত সাতটি দেশে মার্কিন সামরিক অভিযানের চাপ রয়েছে। তবে প্রশাসন সেই সতর্কতাকে গুরুত্বহীন বলে দেখানোর চেষ্টা করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পাল্টা হামলার দক্ষতা অনেককেই বিস্মিত করেছে। ইরান কখনও কখনও এমনভাবে আঘাত হেনেছে যে মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেমন রাডার বা কমান্ড-এন্ড-কন্ট্রোল অবকাঠামো, চাপে পড়ে গেছে।

এদিকে, মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যাতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার নির্ভুলতা বাড়ানো যায়। এতে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সামরিক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে, তার কিছুটা ক্ষতিপূরণ হতে পারে।

যুদ্ধের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটেছে—কুয়েতে ভুলবশত বন্ধুত্বপূর্ণ গুলিবর্ষণে তিনটি মার্কিন F-15 যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। ক্যানসিয়ানের হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি বিমানের দাম প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার।

এ পর্যন্ত সংঘাতে সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জন কুয়েতে ইরানি ড্রোন হামলায় এবং আরেকজন সৌদি আরবে একটি আক্রমণে প্রাণ হারান।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles