বাংলাস্ফিয়ার: এভিন কারাগারে বন্দীদের জেরা করা হয় অদ্ভুত এক কায়দায়। বন্দির চোখ বাঁধা, মুখ দেয়ালের দিকে, জেরাকারীরা পেছনে — অদৃশ্য। শুধু ভেসে আসে প্রশ্নের কণ্ঠস্বর। সেই অন্ধকারেই বন্দি কল্পনা করে — ওরা কি তরুণ, না বৃদ্ধ? নিষ্ঠুরতায় পাকা, না সদ্য ক্ষমতার যন্ত্রে যুক্ত?
এই বর্ণনা ইরানের বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহির নিজের। তিনি নিজেই দুবার বন্দি হয়েছেন এই ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের হাতে। সেই অভিজ্ঞতা এবং সহবন্দিদের স্মৃতি থেকে জন্ম নিয়েছে তাঁর নতুন চলচ্চিত্র — “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”। আগামী ১৫ মার্চ অনুষ্ঠেয় অস্কারে ছবিটি দুটি বিভাগে মনোনীত।
ছবির সূচনা এক আপাত তুচ্ছ ঘটনায়। একটি পরিবার গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটি কুকুরকে ধাক্কা দেয়, আর সেই দুর্ঘটনায় তাদের গাড়িটি অচল হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় জড়িয়ে যান স্থানীয় শ্রমিক বাহিদ। বাহিদ—যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাহিদ মোবাসেরি—সন্দেহ করতে শুরু করেন যে গাড়ির চালক, যিনি চরিত্রে ইব্রাহিম আজিজি, সম্ভবত সেই ব্যক্তি, যিনি একসময় তাকে কারাগারে নির্মমভাবে নির্যাতন করেছিলেন। সন্দেহের সত্যতা যাচাই করার জন্য বাহিদ তাকে অপহরণ করে নিজের ভ্যানে বেঁধে ফেলে, মুখে কাপড় গুঁজে দেয়, এবং নিয়ে যায় অন্য কয়েকজন বেঁচে থাকা বন্দির কাছে—যাদের মধ্যে একজন নারী আছেন, যিনি ঠিক সেই মুহূর্তে বিয়ের পোশাক পরে ছবি তুলছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটিকে তারা কীভাবে চিনবে? তারা তো তাকে কখনো দেখেনি। ফলে তারা ভরসা করে অন্য চিহ্নের ওপর—তার কৃত্রিম পায়ের কটমট শব্দ, শরীরের ঘামের গন্ধ, ত্বকের স্পর্শের ভাঁজ। সেই অন্ধকার যন্ত্রণার স্মৃতিই হয়ে ওঠে পরিচয়ের একমাত্র সূত্র।
ছবিটি একাধারে থ্রিলার — তারা কি সত্যিই সঠিক মানুষটিকে ধরেছে? ধরলেও তার সঙ্গে কী করবে? কিন্তু একই সঙ্গে এটি এক অদ্ভুত, প্রায় অ্যাবসার্ড অভিযাত্রাও। মরুভূমির মধ্যে একটা গাছের পাশে গাড়ি থামিয়ে বন্দির ভাগ্য নিয়ে যখন তারা তর্কে জড়িয়ে পড়ে, তখন স্যামুয়েল বেকেটের নাটক “ওয়েটিং ফর গডো”-র কথা উঠে আসে। আর তখন দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে—এই ছবির আসল “দুর্ঘটনা” কোনটি? গাড়ির ধাক্কায় কুকুরটির মৃত্যু? চালকের সঙ্গে বাহিদের আকস্মিক মুখোমুখি হওয়া? নাকি সেই বৃহত্তর বাস্তবতা—একটি নির্মম, খামখেয়ালি রাষ্ট্রের অধীনে মানুষের বেঁচে থাকার সমগ্র পরিস্থিতি?
মূলত ছবিটি এক গভীর নৈতিক অনুসন্ধান—স্বৈরতন্ত্রের ভিতরে কিংবা তার পরে মানুষের নৈতিক দায়িত্ব কোথায় দাঁড়ায়? একজন চরিত্র যুক্তি দেয়, জেরাকারী তো কেবল যন্ত্রের একটি অংশ মাত্র, ব্যবস্থার একটি ছোট চাকা। কিন্তু আরেকজন তীব্র প্রতিবাদ জানায়: “এই নোংরা লোকগুলিই তো সেই ব্যবস্থাটা বানিয়েছে!” কেউ বলে, “আমরা খুনি নই, আমরা ওদের মতো নই।” আবার অন্যদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে।
তবু শেষ পর্যন্ত গল্পটি এক অদ্ভুত আশার দিকেই এগোয়। কারণ এটি এমন এক অবস্থানে পৌঁছায় যেখানে খলনায়কের মধ্যেও মানুষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয় না। একই সঙ্গে এটি রূপকের ভেতর দিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করে, যখন বিচার অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। লন্ডনে সাম্প্রতিক এক সফরে পানাহি বলেন, “আমরা কি সহিংসতার এই চক্রটাকে থামাব, নাকি তাকে চলতেই দেব? — এটাই ছবির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।”
শহরের বাইরে বাহিদ ও তার সঙ্গীরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু রাজধানীর ভেতরে একজন অপহৃত নির্যাতককে নিয়ে ঘোরাফেরা করা অনেক বেশি বিপজ্জনক। এই দিক থেকে ছবির চরিত্রদের বিচিত্র যাত্রাপথ যেন প্রতিফলিত করে পানাহির নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণের বাস্তব ঝুঁকিকেও। তাঁর দলটি ছিল অনুমতিহীন। তাই তারা প্রথমে মরুভূমির দৃশ্যগুলো শুট করে, তারপর ভ্যানের ভেতরের অংশ ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ দৃশ্য। সবশেষে শহরের খোলা রাস্তায় দৃশ্য শুট করতে গেলে পুলিশ এসে বাধা দেয়।
পুলিশ এসে বাধা দেয়।
এই ধরনের বাধা পানাহির জন্য নতুন নয়। দীর্ঘ কারাবাস, একাকী বন্দিত্ব, অনশন — এবং একসময় চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা। তার জবাবে তিনি নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরেই বানান “দিস ইজ নট আ ফিল্ম”। পরে তেহরানের রাস্তায় ট্যাক্সি চালাতে শুরু করেন। হাসতে হাসতে বলেন, ড্রাইভিংই ছিল তার একমাত্র অন্য দক্ষতা আর যাত্রীদের কথোপকথনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করেন “ট্যাক্সি তেহরান”।
এখন বিদেশে থাকাকালীন ইরানে তাকে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অস্কার-মনোনীত চিত্রনাট্যের সহলেখক মেহদি মাহমুদিয়ানকেও কিছুদিনের জন্য বন্দি করা হয়। তবু পানাহি বলেছেন, অস্কার অনুষ্ঠানের পর তিনি দেশে ফিরবেন। “ওটাই তো আমার দেশ” — এটুকুই তাঁর উত্তর।
তার মতে, যুদ্ধ না হলেও, প্রতিবাদীদের রক্তপাতই দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরানের শাসকরা একপ্রকার অচলাবস্থায় পৌঁছে গেছে। আর কেউ যদি তাকে সিনেমা বানানো থেকে বিরত করতে চায়, তবে তিনি বলেন, “ওটা তাদের সমস্যা—আমার নয়। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।” অতীতে তাকে থামানোর যত চেষ্টা হয়েছে, সেগুলো শুধু ব্যর্থই হয়নি বরং উল্টো ফল হয়েছে। তার শাস্তিই পর্দায় রূপ নিয়েছে নাটকীয়তা ও মর্যাদায়। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই বলেন, যদি তাকে এভিন কারাগারে পাঠানো না হতো, তবে হয়তো তিনি এই ছবিটিই কখনো বানাতেন না।
সব দমনপীড়নের অস্ত্র হাতে নিয়েও, শিল্পীর সঙ্গে এই অসম সংগ্রামে ক্ষমতাবান শাসকেরা শেষ পর্যন্ত প্রায়ই হেরে যায়—কারণ কল্পনা, স্মৃতি এবং সত্যকে বন্দি করে রাখা যায় না।