Home দৃষ্টিভঙ্গিমগজাস্ত্রে শান বিরক্তিকর মানুষ, দ্রুত বার্ধক্য – কী বলছে গবেষণা?

বিরক্তিকর মানুষ, দ্রুত বার্ধক্য – কী বলছে গবেষণা?

0 comments 1 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: জীবনের পথে আমরা নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশি। কেউ আমাদের শক্তি জোগায়, আনন্দ দেয়, বেঁচে থাকার অর্থ বাড়িয়ে তোলে। আবার কেউ কেউ আছে—যাদের উপস্থিতি যেন এক অদৃশ্য চাপের মতো। তারা সরাসরি শত্রু নয়, আবার বন্ধুও নয়; কিন্তু তাদের সঙ্গে সময় কাটানো মানেই অকারণ জটিলতা, অস্বস্তি, মানসিক ক্লান্তি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এই ধরনের মানুষ—যাদের গবেষকেরা “হ্যাসলার” বা জীবনে ঝামেলা তৈরি করা মানুষ বলে আখ্যা দিয়েছেন—তাদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক কেবল মন খারাপই করে না, দীর্ঘমেয়াদে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি আমাদের শরীরকে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এই গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে এবং প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences-এ। গবেষকেরা “হ্যাসলার” বলতে এমন মানুষকে বোঝান, যারা অন্যের জীবনে সমস্যার সৃষ্টি করে বা জীবনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তোলে।

ইতিবাচক সম্পর্ক মানুষকে দীর্ঘায়ু ও সুস্থ রাখে — এটি বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানেন। কিন্তু নতুন এই গবেষণা সেই ছবির উল্টো পিঠটিও সামনে এনেছে। যেসব সম্পর্ক ক্রমাগত চাপ, বিরক্তি বা দ্বন্দ্ব তৈরি করে, সেগুলো শরীরে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক সূচকগুলো বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সবাই সমানভাবে এই চাপ অনুভব করেন না। নারীরা এবং যাদের শারীরিক স্বাস্থ্য আগে থেকেই দুর্বল, তারা জীবনে বেশি “হ্যাসলার” শনাক্ত করেন বা অনুভব করেন।

গবেষণার প্রধান লেখক, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিয়ুংকিউ লি বলেন, শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক মানুষের বার্ধক্যকে ধীর করতে পারে—এমনকি কোষের স্তরেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু সব সম্পর্কই সমানভাবে সহায়ক নয়। অনেক সম্পর্ক এমন হয়, যেখানে সমর্থন ও স্নেহের পাশাপাশি সমস্যা ও চাপও থাকে। আবার কিছু সম্পর্ক প্রায় পুরোপুরিই মানসিক চাপের উৎস।

এই কম-ইতিবাচক সম্পর্কগুলো দীর্ঘমেয়াদে এক ধরনের স্থায়ী চাপের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। লির ভাষায়, “এ ধরনের মানুষ যদি নিয়মিত আপনার জীবনে থাকে, তাহলে তারা আপনার দৈনন্দিন জীবনকে সত্যিই কঠিন করে তুলতে পারে।”

নেতিবাচক সম্পর্ক শরীরের জৈবিক বার্ধক্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে তা বোঝার জন্য গবেষকেরা ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে পরিচালিত একটি স্বাস্থ্য সমীক্ষা থেকে দুই হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেন। অংশগ্রহণকারীদের গত ছয় মাসে তাদের সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করা হয়। এরপর তাদের জিজ্ঞেস করা হয়, সেই মানুষগুলো কতটা বিরক্তি সৃষ্টি করে, সমস্যা তৈরি করে বা তাদের জীবনকে কঠিন করে তোলে।

অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও মূল্যায়ন দেন। পাশাপাশি তাদের লালা নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এই নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ডিএনএ-তে এমন কিছু পরিবর্তন শনাক্ত করেন, যেগুলো জৈবিক বার্ধক্যের সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে তারা তুলনা করতে পারেন—যাদের সামাজিক বৃত্তে “হ্যাসলার” আছে এবং যাদের নেই, তাদের শরীরের বার্ধক্যের গতি কতটা আলাদা।

ফলাফল ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। দেখা গেছে, একজন মানুষের জীবনে যত বেশি “হ্যাসলার” থাকে, তার শরীরের বার্ধক্যের গতি তত বাড়ে। গড় হিসেবে, প্রতিটি অতিরিক্ত “হ্যাসলার” থাকার ফলে বার্ধক্যের গতি প্রায় ১.৫ শতাংশ বেড়ে যায়। অর্থাৎ সাধারণভাবে যেখানে এক ক্যালেন্ডার বছরে শরীর এক জৈবিক বছর বয়সী হয়, সেখানে একজন মানুষের জীবনে যদি একটি অতিরিক্ত “হ্যাসলার” থাকে, তাহলে একই সময়ে তার শরীর প্রায় ১.০১৫ বছর বয়সী হয়ে ওঠে।

এই পার্থক্য খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু গবেষক ব্রিয়া পেরি বলেন, “জৈবিক বার্ধক্যের ক্ষেত্রে এমন ছোট ছোট প্রভাবও সময়ের সঙ্গে জমতে থাকে।” এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগ আগেভাগেই দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে যেসব মানুষের জীবনে দুই বা তার বেশি “হ্যাসলার” রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট ছিল।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণা সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না। লি বলেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে ‘হ্যাসলার’ মানুষগুলোই কাউকে দ্রুত বুড়ো করে দেয়। আমরা শুধু দেখতে পাচ্ছি, এই ধরনের মানুষের উপস্থিতি এবং দ্রুত বার্ধক্যের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে।”

গবেষণায় আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় দেখা গেছে—কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় বেশি “হ্যাসলার” অনুভব করেন। নারীদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ডেবরা আমবারসন বলেন, এটি খুব আশ্চর্যজনক নয়। বিদ্যমান গবেষণা বলছে, পুরুষ ও নারীরা সম্পর্ককে ভিন্নভাবে অনুভব করেন। নারীরা সাধারণত সম্পর্কের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকেই বেশি সংবেদনশীল হন।

পেরি বলেন, নারীরা অন্যদের সমস্যাকে বেশি উপলব্ধি করেন এবং প্রায়ই সেই সমস্যাকে নিজের চাপ হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে তাদের জীবনে এমন মানুষের উপস্থিতি বেশি মনে হতে পারে, যারা ঝামেলা বা মানসিক চাপ তৈরি করে।

আরও দেখা গেছে, যাদের শারীরিক স্বাস্থ্য দুর্বল, তাদের জীবনে “হ্যাসলার” থাকার সম্ভাবনাও বেশি। কারণ অসুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিবার বা পরিচিতজনেরা তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ করতে পারেন—যা কখনও কখনও বিরক্তিকর বা চাপের উৎস হয়ে ওঠে। একইভাবে, যাদের শৈশব কঠিন বা আঘাতপূর্ণ ছিল, তারাও পরবর্তী জীবনে নেতিবাচক সম্পর্কের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারেন।

গবেষণায় আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—এই “হ্যাসলার”দের বড় অংশই পরিবারের সদস্য। কারণ পরিবার এমন একটি সম্পর্ক, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। অনেক সময় সেই সম্পর্ক পুনর্গঠন করাও কঠিন।

পরিবারের মধ্যে বাবা-মা বা সন্তানেরা প্রায়ই “হ্যাসলার” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে—যেখানে সঙ্গী বা দাম্পত্য সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কম। পরিবার ছাড়া কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী, রুমমেট এবং কখনও কখনও প্রতিবেশীরাও এমন মানুষ হতে পারেন, যারা জীবনে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করেন।

তাহলে এর থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?

গবেষকেরা বলছেন, সবচেয়ে সহজ পরামর্শ হলো—যদি সম্ভব হয়, এমন সম্পর্ক এড়িয়ে চলা বা প্রয়োজনে ছিন্ন করা। কিন্তু বাস্তবে এটি সব সময় সম্ভব নয়। পরিবার বা কর্মক্ষেত্রের অনেক সম্পর্কই এমন, যেগুলো থেকে সহজে বেরিয়ে আসা যায় না।

সে ক্ষেত্রে কিছু কৌশল কাজে লাগতে পারে। যেমন, সেই ব্যক্তির সঙ্গে সময় কাটানোর পরিমাণ কমানো, সম্পর্কের সীমা নির্ধারণ করা, বা প্রয়োজনে থেরাপির সাহায্য নেওয়া। পেরির মতে, “সীমানা নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন বুঝতে পারবেন যে কেউ আপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তখন সেই সম্পর্কের জন্য আপনি কতটা শক্তি ব্যয় করবেন তা সীমিত করা দরকার।”

এছাড়া “হ্যাসলার”দের সঙ্গে দেখা করার আগে বা পরে নিজের যত্ন নেওয়ার মতো কিছু কাজ করা—যেমন বিশ্রাম, ধ্যান বা আনন্দদায়ক কাজ—মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

গবেষকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন—শুধু নেতিবাচক সম্পর্ক কমানো নয়, ইতিবাচক সম্পর্ক বাড়ানোও সমান জরুরি। লি বলেন, “যদি আপনার সামাজিক পরিসরে পর্যাপ্ত সহায়ক মানুষ থাকে, তাহলে তারা হয়তো এই নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।”

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। গত বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ৮ লক্ষ ৭১ হাজার মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে।

ডেবরা আমবারসনের কথায়, “মানুষের জীবনে সম্পর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই সত্যটাকে আমরা কখনওই ভুলে যেতে পারি না।”

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles