বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় ভারত এক জটিল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। সরাসরি সংঘাতে না জড়ালেও এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব এড়ানো ভারতের পক্ষে কঠিন হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যদিও এখনই পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—স্ট্রেইট অব হরমুজ—দিয়ে ভারতের তেল সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই, তবু এই সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব ভারতের মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতির উপর পড়তে বাধ্য। ফলে ভারত সরকার ইতিমধ্যেই জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির বড় প্রেক্ষাপটটি বোঝা জরুরি। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে স্ট্রেইট অব হরমুজ হয়ে। এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর, যার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়। যদি আমেরিকা–ইরান সংঘাতের কারণে এই পথ অচল হয়ে পড়ে বা সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়ে, তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। সেই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের অর্থনীতিতে।
এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ভারত ইতিমধ্যে কিছু কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। দেশের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে হঠাৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও কিছু সময়ের জন্য দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানো যায়। পাশাপাশি ভারত তার তেল আমদানির উৎসও ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে—মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি রাশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও তেল সংগ্রহের পথ খোলা রাখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। আমদানিনির্ভর ভারতের জন্য এর অর্থ হবে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, এবং সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের বাজারের থলেতে।
ভারতের নীতিনির্ধারকেরা তাই একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্যও বজায় রাখতে চাইছেন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও ভারত এমন নীতি অনুসরণ করছে যাতে বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহের সুযোগ বজায় থাকে এবং কোনো একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি সংকটজনক না হলেও এর সম্ভাব্য প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা–ইরান সংঘাত যদি আরও তীব্র হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই অস্থির করবে না, বরং ভারতের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এই অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিবেশে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।