বাংলাস্ফিয়ার: ভারতে গৃহস্থালির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দামে আবারও বৃদ্ধি ঘটেছে। ৭ মার্চ ২০২৬ থেকে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ₹৬০ বাড়ানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে—বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠনগুলি রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, কারণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ইতিমধ্যেই দ্রুত বেড়ে চলেছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় এলপিজির একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে—প্রায় ৪৬.৯ শতাংশ এলপিজি আসে সেই অঞ্চলগুলি থেকে, যেগুলি বর্তমানে ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার সরাসরি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার অভিঘাত ভারতের বাজারে এসে পড়া প্রায় অবশ্যম্ভাবী। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল—একদিকে জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তার উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমিয়ে রাখা।
সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়েছে, গৃহস্থালির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ₹৬০ বাড়ানো হয়েছে, আর বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ₹১১৫। বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল রান্নার গ্যাসের খরচই বাড়াবে না, বরং সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এলপিজি শুধু গৃহস্থালির রান্নার জ্বালানি নয়—ছোট রেস্তোরাঁ, খাদ্য ব্যবসা এবং নানা ক্ষুদ্র পরিষেবা ক্ষেত্রও এর উপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের দাম বাড়লে সেই খরচ শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য ও পরিষেবার দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে যে ক্রমাগত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বহু পরিবার এখনও কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং চলমান মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে; তার উপর রান্নার গ্যাসের দাম বাড়া মানে মাসিক গৃহস্থালির বাজেটে নতুন বোঝা যোগ হওয়া। এই কারণেই বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে আজকের বিশ্বে জাতীয় অর্থনীতি আর বিচ্ছিন্ন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, কূটনৈতিক সংঘাত বা জ্বালানি সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে আগামী দিনে ভারতের জ্বালানি নীতি—বিশেষ করে আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভোক্তাদের জন্য ভর্তুকি বা সহায়তার ব্যবস্থা—আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।