সুদীপ্ত ভট্টাচার্য: গত পঁচিশ বছর ধরে আমেরিকার আমজনতার কাছে যুদ্ধ ব্যাপারটা এমন গা সওয়া হয়ে গেছে যে কবে কোথায় মার্কিন বিমান কি নৌবহর গিয়ে দুটো বোমা মেরে আসছে তাতে আমেরিকানদের দৈনিক জীবনে আর কোনও হেলদোল হয় না । ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যেরকম একটা সামগ্রিক বিক্ষোভ দেশটার আনাচে কানাচে দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়েছিল, সেরকমটা এদেশে তার পর থেকে আর কখনোই দেখা যায় নি । আর আফগানিস্তানে গিয়ে যুদ্ধটা তো আমেরিকার কাছে সম্মানের লড়াই ছিল, তাই সে নিয়ে আমজনতার সমর্থন পেতে দেশের সরকারের কোনও সমস্যাই হয় নি । তার বছর দুয়েক বাদে বুশ -এর সরকার যখন সাদ্দাম হোসেনকে নিকেশ করতে ইরাকে সেনা পাঠিয়ে দিলো, তখন সেই নিয়ে আলোচনা অনেক শুনেছি, কিন্তু সেভাবে ক্ষোভের প্রকাশ দেখতে পাইনি । কারণ কিছু মানুষের ধারণা ছিল ছেলে বুশ বাবা বুশের অসম্পূর্ণ কাজটাই শেষ করতে নেমেছে, কেউ বলেছিলো আরে বুশ তো নিমিত্ত মাত্র, আসল নাটের গুরু তো ওই চেনি আর রামসফিল্ড, কেউ বা হাসতে হাসতে মন্তব্য করেছিল আরে যুদ্ধ না বাধালে এক) সস্তায় তেল মিলবে কি করে? দুই) যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি করতে হলে তো যুদ্ধ দরকার, অতএব …. তিন) যুদ্ধ না করলে মার্কিন সেনাদের পদোন্নতি হবে কী করে? ইত্যাদি, ইত্যাদি । মানে কি হচ্ছে সেটা বড় কথা নয়, কেন হচ্ছে সেটাই আসল!
তার পর গঙ্গা-ভলগা-পোটোম্যাক দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। মার্কিন জনতা নিজের দেশের নানারকম সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে দিব্যি দিন কাটিয়ে দিয়েছে । ইরানকে সবক শেখানোটা যে মার্কিনী “গণতন্ত্র পূজারী” জনতার একটা অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে সেই লব্জ-টাও আর ২০০৬/২০০৮ এর পর থেকে সেভাবে শোনা যায়নি ।
তারপর সেই লক্ষণের শক্তিশেল নাটকে “আবার সে আসিছে ফিরিয়া” বলে হঠাৎ করে পাগলা দাশুর স্টেজে উঠে পড়ার মতো করে গত সপ্তাহ থেকে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো! দীর্ঘদিন এদেশে বাস করবার ফলে মার্কিনি মানসিকতার সঙ্গে যেভাবে পরিচিত ছিলাম তাতে এই যুদ্ধ বিষয়ে আমজনতার নিষ্ক্রিয়তাই আসা করেছিলাম । কিন্তু এখন দেখছি আশ্চর্য হওয়ার এখনও ঢের বাকি আছে । কারণ পরিচিত-অর্ধ-পরিচিত, বন্ধুস্থানীয় যার সঙ্গেই কথা হচ্ছে, প্রায় সকলকেই দেখছি এই একই মন্তব্য করছে: “ঠিক কী জন্যে এই যুদ্ধটা করছি আমরা?”
আমার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে এক মহিলা আছেন, যাঁর পরিবার ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তু ছিলেন, যে কারণে তিনি নিজে জর্ডনে বড় হয়েছেন । ভদ্রমহিলা প্রচুর পড়াশোনা করেন, খোঁজখবর রাখেন । পশ্চিম এশিয়া এবং ইজরায়েল সংক্রান্ত নানারকম চিত্তাকর্ষক খবরের ব্যাপারে তাঁকে আমি মনে মনে “সিধুজ্যাঠা”র সন্মান দিই । তাঁর কাছে বহুবার শুনেছি সন্ত্রাসবাদ, হামাস, হিজবুল্লা, এসব লোকদেখানো, ছেলেভোলানো গপ্পো-কথা । ইজরায়েলের এই চূড়ান্ত আগ্রাসনের মূল লক্ষ্য একটাই: বৃহত্তর ইসরায়েল! মধ্যপ্রাচ্যে সাদাদের একটা উপনিবেশ তৈরি করাই এই সব যুদ্ধের একমাত্র উদ্দেশ্য, ইত্যাদি। কখনো ওনার বলা এইরকম নানান কথা বিশ্বাস করেছি, কখনও আবার ফিলিস্তিনী শিকড়ের কারণে ইজরায়েল বিষয়ে ওঁর ক্ষোভ বাস্তবতাকে অতিক্রম করে এরকম ভেবে তাঁর বলা কথা ভুলেও গেছি । কিন্তু এই ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমি মার্কিন আমজনতাকে যেভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে দেখছি তাতে ওনার এতদিন ধরে বলে চলা কথাগুলোকে আর একজন উদ্বাস্তুর ক্ষোভ মিশ্রিত দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে উড়িযেও দিতে পারছি না ।
এ বিষয়ে আমার এক বন্ধুস্থানীয়ের বক্তব্যকে আমি বিশেষ ভাবে তুলে ধরতে চাই । আমার এই বন্ধুটি নিজে একজন অবসরপ্রাপ্ত নেভি সীল । স্পেশাল অপারেটিভ ফোর্স এর সদস্য হিসাবে আফগানিস্তান, ইরাক সর্বত্রই সেনানী হিসাবে সতিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে এসেছেন । ফলে তিনি যে একজন রিপাবলিকান সে তো বলাই বাহুল্য । কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যখন দেখলাম তিনি তাঁর পার্টি-লাইন থেকে সম্পূর্ণ সরে গিয়ে কথা বলছে, তখন তা ভূতের মুখে রামনামের মতোই শোনালো । এবার বলি তার কাছে কীসকী শুনলাম:
১. আজকের আমেরিকা ইসরায়েলের নির্দেশে চলে
২. ওয়াশিংটন ডিসির সবচেয়ে বড় যে লবিস্ট অর্গানিজশন, সেটি একটি ইজরায়েলি সংস্থা । অর্থাৎ বেশির ভাগ মার্কিন আইন প্রণেতার (অর্থাৎ সেনেটর, জনপ্রতিনিধি, ইত্যাদির) টিকি এই সংস্থার কাছে বাঁধা আছে ।
৩. বৃহত্তর ইজরাযেলের পথে ইরান এক বড় কাঁটা, সেই কাঁটা সরাতে তারা আমেরিকাকে কাজে লাগাচ্ছে ।
৪. পশ্চিম এশিয়ায় শ্বেতাঙ্গদের একটা উপনিবেশ তৈরি করাই এই সব যুদ্ধের একমাত্র উদ্দেশ্য ।
৫ এপস্টাইন ফাইলে দুনিয়া জুড়ে বহু তাবড় তাবড় মানুষের সম্পর্কে যা সব তথ্য আছে, তা বেরিয়ে এলে বহু সরকারেরই গদি টলে যাবে । তাই, এপস্টাইন ফাইল থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে এই যুদ্ধ একটা দাবার চাল ।
৬. গত পঞ্চাশ ষাট বছরে আমেরিকা আদতে একটি যুদ্ধও জিততে পারেনি ।
৭. সিআইএ বছরের পর বছর ধরে এ তল্লাটের
একের পর এক দেশে সন্ত্রাসবাদ বপন করেছে, তারপর সেই সন্ত্রাসবাদ নিকেশ করবার নামে আমেরিকাই মধ্যপ্রাচ্যের একের পর এক দেশকে ধ্বংস করছে ।
৮. রাশিয়ার চেয়ে আমেরিকা একই দোষে হাজার গুন্ বেশি দোষী ।
এই ফর্দকে আর বড় করবার কোনও মানে হয় না । কিন্তু একজন কর্মক্ষেত্রে সফল ও সন্মানীয়, অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনানী যখন এই সব কথা বলেন, তখন সেগুলো প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে বৈকি! আমজনতার চায়ের কাপে তুফান অথবা নিষ্কর্মার বাতুলতা বলে আর সেগুলোকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, আজই আমার এক বিমানচালক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিলো, যিনি ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স এর বিমান চালিয়ে শিকাগো থেকে দিল্লী, ইসলামাবাদ, সর্বত্রই যান । তাঁরও বক্তব্য সেই একই! যে কার যুদ্ধ, কে লড়ছে! কেনই বা লড়ছে? ইরান তো আমাদের কোনও পাকা ধানে মই দেয়নি । তাহলে আমরা এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লাম কী করে? মাঝখান থেকে ওনাকে এখন একই গন্তব্যে যাওয়ার জন্যে দু-ঘন্টা বেশি বিমান চালাতে করতে হবে, কারণ যুদ্ধের কারণে প্রচলিত আকাশ সীমা গুলো অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে রয়েছে।
যাদের দেশে যুদ্ধ চলছে, এদেশে বসবাসকারী সেই ইরানীরা কি ভাবছেন? বোঝার উপায় নেই । কারন এদেশে সাম্প্রতিককালে যে ধরনের “একুশে আইন” চালু হয়েছে তাতে বেফাঁস কিছু বলে ফেলে শেষে ঘাড় ধাক্কা খেয়ে দেশান্তরী হওয়ার ভয় আজকাল প্রায় সকল অভিবাসীদেরই মনে কাজ করে । অতএব মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর গতি কি? যে সহে সে রহে; তাই না?! তবে সবক তথা গণতন্ত্র শেখাতে গিয়ে কোনও এক দেশে ঢুকে পড়ে সেই দেশের সাড়ে সর্বনাশ করার যে সাম্প্রতিক লেগাসি আমেরিকা নিজে হাতে তৈরি করেছে, তাতে মোল্লাতন্ত্রর বদলে নতুন কোন আপদ এসে জুটবে সেই চিন্তায় এদেশের অভিবাসী ঘরপোড়া ইরানীরা যে ইতিমধ্যেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন, সে তো আন্দাজ করাই যায় ।