Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯২.৬৯ ডলারে পৌঁছেছে—যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
খামেনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত
সাম্প্রতিক সামরিক ঘটনাগুলো সংঘাতকে আরও বিস্তৃত রূপ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাই বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শেয়ারবাজারেও ধস, স্ট্যাগফ্লেশনের ভয়
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোন্সের মতো প্রধান শেয়ার সূচকগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে। পাশাপাশি অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিশ্ব অর্থনীতি স্ট্যাগফ্লেশনের—অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়া এবং একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির—এক বিপজ্জনক অবস্থায় পড়তে পারে।
পাঁচটি বিষয়ে স্পষ্ট হচ্ছে সংকটের গভীরতা
এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোন্সের মতো প্রধান শেয়ার সূচকগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে পড়ে গেছে। তৃতীয়ত, ভারতের প্রতিদিনের প্রায় ২৫ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে, ফলে এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ভারত বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চতুর্থত, বিশ্লেষকেরা মনে করছেন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, যা তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে। পঞ্চমত, বাজারের এই অস্থিরতা কমাতে ওপেক প্লাস জোট তেল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বিবেচনা করতে পারে।
পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ইতিহাস বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত ঘটলেই তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং তার ঢেউ আছড়ে পড়ে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরনো বাস্তবতাকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। বাজারের এই অস্থিরতা সামাল দিতে ওপেক প্লাস জোট তেল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বিবেচনা করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা—তবে তা যথেষ্ট হবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ভারতের সামনে কঠিন পরীক্ষা
তেলের দাম বাড়লে তার ধাক্কা শুধু পেট্রোল-ডিজেলের পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত—সবখানেই এর আঁচ লাগে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে।
এই সংকট তাই ভারতের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে যাচ্ছে—জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া এখন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়, এটি এই মুহূর্তের অনিবার্য প্রয়োজন।