বাংলাস্ফিয়ার: ২০০৬ সালের সিঙ্গুর অনশন আর আজ মমতার এস-আই-আর বিরোধী ধর্ণা—দুটোই বাহ্যিকভাবে প্রতিবাদ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা দুই ভিন্ন যুগের দুই ভিন্ন রাজনৈতিক নাটক। একটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী নেত্রী; অন্যটিতে তিনি নিজেই ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ফলে এই দুই ঘটনার পার্থক্য শুধু ঘটনাগত নয়, এটি রাজনীতির চরিত্র বদলেরও গল্প।
১. ক্ষমতার অবস্থান
২০০৬-এ মমতা ছিলেন ক্ষমতার বিপরীতে বিরোধী নেত্রী।
২০২৬-এ তিনি নিজেই ক্ষমতার শীর্ষে, দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী।
অর্থাৎ তখন তিনি “অত্যাচারের শিকার” এখন তিনি নিজেই “অত্যাচারে অভিযুক্ত”।
২. লক্ষ্যবস্তু
সিঙ্গুরে তাঁর লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্ট সরকার। বিশেষ করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
এখন তাঁর ধর্ণার লক্ষ্য মূলত কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ তখন শত্রু ছিল রাজ্য সরকার, এখন শত্রু “বহিরাগত শক্তি”।
৩. নৈতিকতার উলট পুরান
২০০৬-এ মমতা দাবি করতেন তিনি কৃষকদের জমি বাঁচাতে লড়ছেন।
আজকের ধর্ণায় দাবি, গণতন্ত্র বাঁচাতে লড়ছেন।
দু’টি ক্ষেত্রেই স্লোগান নৈতিক, কিন্তু প্রেক্ষাপট আলাদা।
৪. অনশন বনাম ধর্ণা
সিঙ্গুরে ছিল নাটকীয় ২১ দিনের অনশন, শারীরিক ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন।
এবার অনশনের বালাই নেই, কোনও ঝুঁকিও নেই।এবারের ধর্ণা অনেক বেশি আরামের, বিশাল মঞ্চ, বিলাসী বিশ্রামের ব্যবস্থা আর শুধু বকবক আর বকবক—মাইক্রোফোন, মঞ্চ, বক্তৃতা।
৫. আবেগের তীব্রতা
২০০৬-এ আন্দোলনে ছিল আবেগের তীব্রতা, সত্যিকারের উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা, জনমত গঠন।
এবারের ধর্ণা দৃশ্যতই একটি “স্ক্রিপ্টেড প্রতিবাদ” যাতে ঝাঁঝ আছে কিন্তু অন্তঃসারশূন্য।
৬. প্রতীকী ছবি
সিঙ্গুরে ছিল মাটির কাছাকাছি, কৃষকের ক্ষোভ, আর্তনাদ, হতাশা, চোখের জল মিশ্রিত।
আজকের ধর্ণায় আছে ঢাউস ঢাউস ব্যানার, নেত্রীর মেগা সাইজের ছবি,নেতাদের সারি, টিভি ক্যামেরা।
৭. জনসমর্থনের প্রকৃতি
তখন গ্রামবাংলার কৃষক ছিলেন আন্দোলনের কেন্দ্রে।
এখন প্রধানত দলীয় কর্মী ও সমর্থক উপস্থিত।
৮. রাজনৈতিক ঝুঁকি
২০০৬-এর আন্দোলন ছিল জিতেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গের লড়াই।ব্যর্থ হলে মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ।
এখনকার ধর্ণা তুলনামূলক নিরাপদ, ক্ষমতা তাঁর হাতেই।
৯. মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া
সিঙ্গুর আন্দোলনে জাতীয় মিডিয়ার বড় অংশ সহানুভূতিশীল ছিল।
এখন মিডিয়া অনেক বেশি সন্দেহপ্রবণ এবং বিভক্ত।
১০. রাজনৈতিক লক্ষ্য
সিঙ্গুর আন্দোলনের শেষ লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা দখল।
আজকের ধর্ণার লক্ষ্য ক্ষমতা ধরে রাখা।
১১. ভাষার পার্থক্য
২০০৬-এ ভাষা ছিল “জনতার কষ্টের কথা”।
এখন ভাষা অনেক সময় “রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ”।
১২. আন্দোলনের চরিত্র
সিঙ্গুরে আন্দোলন ছিল এক ধরনের grassroots mobilisation।
আজকের কর্মসূচি অনেক বেশি party-driven mobilisation।
১৩. প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি
তখন সিপিএম সরকারকে তিনি “জমি ছিনতাইকারী” হিসেবে তুলে ধরতেন।
এখন তিনি নিজে ক্ষমতায় থেকে প্রতিপক্ষকে “গণতন্ত্র ধ্বংসকারী” হিসেবে তুলে ধরেন।
১৪. ব্যক্তিগত ইমেজ
২০০৬-এ মমতা ছিলেন “সংগ্রামী নেত্রী”।
এখন তাঁর ইমেজ “ক্ষমতাসীন শাসক”, সম্ভোগের শিকার। এখন তাঁর আর অন্যকে দায়ী করার সুযোগ নেই, সব সিদ্ধান্তের দায় তাঁর নিজের।
১৫. রাজনৈতিক নাটকীয়তা
সিঙ্গুরের অনশন ছিল একটি বড় রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট—যার ফল ২০১১-এর পরিবর্তন।
আজকের ধর্ণা থেকে তেমন ঐতিহাসিক মোড় তৈরি হওয়া অসম্ভব।
১৬. ইতিহাসের পরিহাস
সবচেয়ে বড় পার্থক্য এখানেই—
২০০৬-এ তিনি বলতেন সরকার মানুষের কথা শুনছে না।
আজ তাঁর বিরোধীরা ঠিক একই অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধেই তোলে।
শেষ পর্যন্ত এই তুলনা আমাদের একটি বড় রাজনৈতিক সত্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। তা হোল যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবন।
যে নেত্রী একদিন সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন “জমি বাঁচাও”,
আজ তাঁকেই অনেকে প্রশ্ন করছেন, ‘দিদি এ কীসের ধর্ণা, ক্ষমতা বাঁচানোর?’