বাংলাস্ফিয়ার: রবার্ট ডি নিরো মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ করেই কার্নেগি হলের মঞ্চে উঠে এলেন। কোনো পূর্বঘোষণা ছিল না, তবু দর্শকদের প্রবল করতালিতে হলঘর মুখরিত হয়ে উঠল।
অস্কারজয়ী এই অভিনেতা সেদিন নিজের লেখা কোনো কথা বলেননি। বরং তিনি আবৃত্তি করলেন সৌজন্য ও নাগরিক শালীনতার আহ্বান, যা প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন আব্রাহাম লিংকন।
অস্কারজয়ী এই অভিনেতা বললেন:
“Reason, cold, calculating, unimpassioned reason, must furnish all the materials for our future support and defense.”
অর্থাৎ—শীতল, হিসেবি, আবেগহীন যুক্তিই আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি ও রক্ষার সমস্ত উপাদান জোগাবে।
ডি নিরো সেই কথাগুলোই উচ্চারণ করছিলেন, যা লিংকন ১৮৩৮ সালে তাঁর জনজীবনের একেবারে শুরুর দিকে বলেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন—
“Let those materials be molded into general intelligence, sound morality, and in particular, a reverence for the constitution and laws।”
অর্থাৎ সেই উপাদানগুলোকে রূপ দিতে হবে সাধারণ বুদ্ধিমত্তা, সুস্থ নৈতিকতা এবং বিশেষত সংবিধান ও আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায়।
ডি নিরো এসেছিলেন তিব্বত হাউস ইউএস-এর ৩৯তম বার্ষিক তহবিল সংগ্রহের সঙ্গীতানুষ্ঠানে। তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য করেননি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও নেননি — যদিও গত এক দশক ধরে তিনি ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তবু তাঁর বেছে নেওয়া ভাষণের পেছনে আজকের আমেরিকার বাস্তবতার ছায়া মোটেও অস্পষ্ট ছিল না।
ডি নিরো আসলে পড়ছিলেন লিংকনের বিখ্যাত “Lyceum Address”-এর অংশ—একটি সতর্কবাণী, যা লিংকন দিয়েছিলেন জনতার উন্মত্ত সহিংসতা সম্পর্কে। সেই ভাষণটি তিনি ১৮৩৮ সালে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের স্প্রিংফিল্ডে এক তরুণদের বিতর্কসভায় প্রদান করেছিলেন।
এই অনুষ্ঠানের সহপরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট সুরকার ফিলিপ গ্লাস। লিংকনের সেই ভাষণ থেকেই তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন তাঁর নতুন সিম্ফনি—Symphony No. 15, “Lincoln”-এর জন্য। এই সিম্ফনির প্রথম পরিবেশনা হওয়ার কথা ছিল জুন মাসে কেনেডি সেন্টারে। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতেই গ্লাস ঘোষণা করেন যে তিনি সেই অনুষ্ঠান বাতিল করছেন। তাঁর অভিযোগ ছিল—ট্রাম্প প্রশাসন ওই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করেছে।
মঙ্গলবার রাতের প্রায় তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। তবু উপস্থিত শিল্পীদের অনেকের বক্তব্যেই বোঝা যাচ্ছিল যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।
প্রায় তিন ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে সঙ্গীতশিল্পী এলভিস কস্টেলো, পারফরম্যান্স শিল্পী লরি অ্যান্ডারসন এবং অভিনেত্রী মায়া হকসহ আরও অনেকে মঞ্চে এসেছিলেন। তাঁরা কথা বললেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আশঙ্কা, মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার কঠোর নীতি এবং সমাজে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা ও উদাসীনতার বিষয়ে।
সেই রাতে মঞ্চে কোনো সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না। তবু শিল্পীদের নির্বাচিত শব্দে, কণ্ঠের টানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল একটাই উদ্বেগ — একটি দেশের ভবিষ্যৎ, তার নৈতিক ভিত্তি এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে ঘিরে।