বাংলাস্ফিয়ার: নীতীশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্লান্তি বা আকস্মিক পদক্ষেপ নয়; এর ফলে বিহারের ক্ষমতার কাঠামো, জোট রাজনীতি এবং তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ—সবকিছুতেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রথমেই বিহারের ক্ষমতার সমীকরণের কথা বলা যাক। বহু বছর ধরে বিহারের রাজনীতি মূলত তিনটি শক্তির মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে—জনতা দল(ইউনাইটেড), ভারতীয় জনতা পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল। নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন এই ত্রিভুজের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। কখনও বিজেপির সঙ্গে, কখনও আরজেডির সঙ্গে জোট করে তিনি ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। কিন্তু গত এক দশকে একটি বড় পরিবর্তন হয়েছে—বিহারে বিজেপি সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, আর জেডিইউ ক্রমশ ছোট সঙ্গী হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নীতীশ কুমার যদি নিজে মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে দেন এবং বিজেপিকে সেই পদটি নিতে দেন, তাহলে বিহারের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটবে। স্বাধীনভাবে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী বসা মানে হবে—বিহারের ক্ষমতার কেন্দ্র আর আঞ্চলিক নেতার হাতে নয়, সরাসরি জাতীয় দলের হাতে চলে যাওয়া। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কৌশল—সবকিছুতেই দিল্লির প্রভাব বাড়বে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো নীতীশ কুমারের নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা। তিনি যদি রাজ্যসভায় যান এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তাহলে তিনি মূলত একজন “সিনিয়র স্টেটসম্যান” বা জোট রাজনীতির প্রবীণ মুখে পরিণত হবেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্’র নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোতে তাঁর ভূমিকা হতে পারে সমঝোতার সেতু বা আঞ্চলিক রাজনীতির অভিজ্ঞ মুখ হিসেবে।
এবার আসা যাক নীতীশ কুমারের ছেলে নিশান্ত কুমারের প্রসঙ্গে। বহু বছর ধরে নিশান্ত কুমার সচেতনভাবে রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন। তিনি জনসভা করেন না, দলীয় পদও নেননি। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির বাস্তবতা হলো—কোনো বড় আঞ্চলিক নেতার অবসর বা অবসান ঘটলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জেডিইউ-র মধ্যেও এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে নীতীশ-পরবর্তী নেতৃত্ব কে দেবেন।
যদি নীতীশ কুমার সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যান, তখন দুই ধরনের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। একদিকে জেডিইউ দলটি ধীরে ধীরে বিজেপির সঙ্গে মিশে যেতে পারে বা কার্যত তার অধীনস্থ হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, যদি নীতীশ নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাঁচিয়ে রাখতে চান, তাহলে ভবিষ্যতে নিশান্ত কুমারকে রাজনীতিতে আনতে পারেন। ভারতের অনেক রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে—জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁরা পরিবারের কাউকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন, যাতে রাজনৈতিক পুঁজি নষ্ট না হয়।
তবে একটি বড় বাস্তবতাও আছে। নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড ছিল “সুশাসন” ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর দাঁড়ানো। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ছিল, কিন্তু জেডিইউ সংগঠন খুব শক্তিশালী নয়। ফলে যদি তিনি সরে দাঁড়ান, তাহলে তাঁর দল দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে নিশান্ত কুমারের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করাও সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে এই পদত্যাগকে অনেকেই একটি “ট্রানজিশন মোমেন্ট” হিসেবে দেখছেন—যেখানে একদিকে বিহারে বিজেপির ক্ষমতা আরও সুসংহত হতে পারে, অন্যদিকে নীতীশ কুমার নিজের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়টি জাতীয় স্তরে লিখতে চাইছেন।