Home বড় খবর ইরানে উত্তরাধিকার প্রশ্ন: নেতৃত্বের শূন্যতায় আবার সামনে রুহানির নাম

ইরানে উত্তরাধিকার প্রশ্ন: নেতৃত্বের শূন্যতায় আবার সামনে রুহানির নাম

0 comments 9 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সংবেদনশীল এই পর্যায়ে রুহানির বাস্তববাদী রাজনীতি ও মধ্যপন্থার পরম্পরা আবার নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ইরানের রাজনীতির বড় বড় সন্ধিক্ষণে প্রায়ই আবার আলোচনায় ফিরে আসে হাসান রুহানির নাম—এমন সময়েও যখন তিনি আর সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। আর এখন, আলি খামেনেই আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হওয়ার পর ইসলামিক রিপাবলিক অব্ ইরান এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর পরিবর্তনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে এমন ব্যক্তিদের নাম, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শান্ত করতে বা ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

হাসান রুহানি ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট (২০১৩–২০২১), একজন মুসলিম ধর্মীয় নেতা এবং আইনে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তিনি একসময় “সংস্কার” করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার বাইরে থেকে আসা কেউ নন তিনি—বরং সেই ব্যবস্থারই অংশ। বহু বছর সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভিজ্ঞ সদস্য ছিলেন এবং ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি একজন বাস্তববাদী নেতা হিসেবে প্রেসিডেন্ট হন, যার প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল কূটনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ কমানো।

সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথ

রুহানির জন্ম ১৯৪৮ সালে ইরানের সেমনান প্রদেশের সোরখেহ শহরে। তিনি প্রথমে হাওজা ব্যবস্থায় (ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব্ তেহেরানে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৯ সালে গ্লাসগো  ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ইরানি বিপ্লবের পর তিনি সংসদীয় রাজনীতির মধ্য দিয়েই নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে তিনি টানা পাঁচ দফা ইরানের আইনসভা, অর্থাৎ মজলিস (পার্লামেন্ট অব্ ইরান)-এ নির্বাচিত হন। এই দীর্ঘ সংসদীয় জীবনের মাধ্যমে তিনি বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং দেশের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এই পটভূমিই পরবর্তী সময়ে হাসান রুহানির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে অনেকটাই ব্যাখ্যা করে। তাকে সাধারণত তীব্র মতাদর্শিক সংঘাতে জড়ানো নেতা হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের “সমঝোতার রাজনীতিক” বা consensus man হিসেবে দেখা হয়—যিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মের ভেতরে থেকেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তার বাইরে গিয়ে সংঘাত তৈরির পথে হাঁটেন না।

বিপ্লব-পরবর্তী রাজনীতিতে ‘তৃতীয় পথ’

রুহানির রাজনৈতিক ব্র্যান্ডকে বুঝতে হলে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানের ভেতরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মতাদর্শিক প্রবাহের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার দিকে তাকাতে হয়। ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই এই ইতিহাসকে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী “ডিসকোর্স” বা রাজনৈতিক বয়ানের ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।তবে মতভেদ থাকলেও এই ধারাগুলোর বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের আদর্শ এবং Islamic Republic of Iran-এর ধর্মীয়-সংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
একসময় “ইসলামি বামপন্থা”, পরে “ইসলামি উদারনীতি”, আবার সাবেক নেতা আকবর হাসেমি রাফসনজানির সময় বাজারমুখী অর্থনীতি—এইসব ধারা সামনে আসে। এরপর মহম্মদ খাটামির সময় “ইসলামি গণতন্ত্র” ও “নাগরিক সমাজ”-এর ধারণা গুরুত্ব পায়। তারপর মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সময় সামাজিক ন্যায় ও জনতাবাদী রাজনীতি সামনে আসে।

এই প্রেক্ষাপটেই রুহানি সামনে আনেন “এতেদাল” অর্থাৎ “মধ্যপন্থা” বা “সংযম”-এর রাজনীতি।
এই ধারণার মধ্যেই “মধ্যপন্থা” বা moderation এমন এক রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উঠে আসে, যা রাষ্ট্রব্যবস্থার দুইটি স্তম্ভের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে—একদিকে প্রশাসনিক বাস্তববাদ ও কার্যকর শাসনের প্রতিনিধিত্বকারী “রিপাবলিক”, অন্যদিকে আদর্শ, ধর্মীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব ও বিপ্লবী পরিচয়ের প্রতীক “ইসলামিক” কাঠামো।
২০১৩ সালের নির্বাচনে হাসান রুহানি এই ভারসাম্যের কথাই সামনে আনেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি ছিল কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপ কমানো, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক মেরুকরণ কিছুটা প্রশমিত করা—তবে এমনভাবে, যাতে ইরানের ক্ষমতার সর্বোচ্চ কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না যেতে হয়।

আলোচক থেকে প্রেসিডেন্ট

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে হাসান রুহানি ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ইউরোপের তথাকথিত “ইউরোপীয় ট্রইকা”—ইউনাইটেড কিংডম, ফ্রান্স এবং জার্মানির সঙ্গে। এই সময় পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে তিনি একজন বাস্তববাদী আলোচক হিসেবে পরিচিতি পান। তবে ইরানের কট্টরপন্থী মহলের একাংশ তাঁকে তখন অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগও তোলে।
এই অভিজ্ঞতাই ২০১৩ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তার বড় শক্তি হয়ে ওঠে—তিনি নিজেকে সংঘাতের রাজনীতির(কনফ্রন্টেশনিষ্ট) বদলে আলোচনার পথের (নেগোশিয়েটর) সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন।

২০১৩ সালের জুনে তিনি প্রথম দফাতেই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

রুহানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি—Joint Comprehensive Plan of Action( JCPOA )। এই চুক্তি হয় ইরান ও P5+1 গোষ্ঠীর মধ্যে—আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আমেরিকা ও তার মিত্ররা ইরানের ওপর আরোপিত বেশিরভাগ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং তেহরানকে বিদেশে আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদে প্রবেশাধিকার দেয়। এর বিনিময়ে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে সম্মত হয়।
দেশের ভেতরে রুহানি এই চুক্তিকে অর্থনীতি স্বাভাবিক করার পথ হিসেবে তুলে ধরেন।

২০১৭: দ্বিতীয় মেয়াদ ও ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাত

২০১৭ সালের মে মাসে রুহানি আবারও প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অনেক ইরানির কাছে এটি ছিল আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত।

তবে ক্ষমতার বাস্তব কাঠামো বদলায়নি। প্রেসিডেন্ট দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করলেও নিরাপত্তা সংস্থা, বিচারব্যবস্থা বা বিপ্লবী গার্ডের ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।

কিন্তু কূটনৈতিক সেই উন্মুক্ততা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে আমেরিকাকে ইরান পারমাণবিক চুক্তি Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং আবার কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে হাসান রুহানি যে অর্থনৈতিক স্বস্তির আশা দেখিয়েছিলেন, তার বড় অংশই কার্যত ভেস্তে যায়। কট্টরপন্থীরা নতুন করে যুক্তি পায়—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

প্রেসিডেন্ট-পরবর্তী সময়: রাজনৈতিক নির্বাসন, না কি সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন?

২০২১ সালে হাসান রুহানির প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইরানের রাজনীতিতে রক্ষণশীল শক্তির প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে ধীরে ধীরে তাকে মূল ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলেই মনে হচ্ছিল। পরে তিনি যোগ দেন Assembly of Experts-এ—ইরানের সেই সাংবিধানিক সংস্থা, যার দায়িত্ব দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা।
তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বার্তা সংস্থা Reuters জানায়, Guardian Council রুহানিকে আবারও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দেয়নি।
এর দু’বছর পর, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী দেশ একটি অন্তর্বর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করে—যতক্ষণ না অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করছে। এই সময় অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদের দায়িত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian, বিচার বিভাগের প্রধান Gholam-Hossein Mohseni-Ejei এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য Alireza Arafi।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের রাজনৈতিক অভিজাত মহলের আলোচনায় সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নেতার নাম নিয়ে যখন জল্পনা চলছে, তখন আবারও সামনে আসছে রুহানির নাম।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আলোচনা আসলে রুহানি যে রাজনৈতিক ধারা প্রতিনিধিত্ব করেন তার গুরুত্বকেই তুলে ধরে—যেখানে কৌশলগত সমঝোতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু একই সঙ্গে ইসলামিক রিপাবলিক অব্ ইরানের সাংবিধানিক ও ধর্মীয় কাঠামোর প্রতি আনুগত্যও বজায় থাকে।

ইরান যখন খামেনেই-পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণের পথে এগোচ্ছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশ কি গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বাস্তববাদী মুখগুলিকে সামনে আনবে, নাকি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কঠোর অবস্থান আরও জোরদার করবে?

এই দ্বিধার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছেন রুহানি — তিনি এই ব্যবস্থার স্থপতি নন, আবার এখন আর সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রেও নেই; তবু ইরানের ক্ষমতাকাঠামো কতটা নমনীয় হতে প্রস্তুত, তার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে রয়েছেন তিনি।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles