বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ায় যে নতুন যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার অভিঘাত শুধু ওই অঞ্চলের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এর ঢেউ পৌঁছবে গোটা বিশ্বের কূটনীতি, জ্বালানি অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার ভিত পর্যন্ত। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক আঘাতে ইরানের ক্ষমতার কাঠামো যখন গভীরভাবে কেঁপে উঠেছে, তখন এই সংঘাতের প্রতি বিশ্বের বড় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে হতাশাজনক। কারণ যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতিগত অবস্থানের দাবি করেছে, সেই দেশই এই সংকটময় মুহূর্তে এক ধরনের দ্বিধাগ্রস্ত নীরবতা বেছে নিয়েছে।
ভারতের সরকারি প্রতিক্রিয়ায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনও স্পষ্ট নিন্দা নেই। বরং এমন এক সতর্ক, প্রায় অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যাতে সংঘাতের প্রকৃত দায় এড়িয়ে যাওয়া যায়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভারত ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল—নিজস্ব অভিজ্ঞতার কারণেই। উপনিবেশবাদ, বহিরাগত আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ভারত একসময় দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলেছে। কিন্তু আজ যখন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া সরাসরি সামরিক হামলা চালানো হয়েছে, তখন ভারতের সেই নীতিগত কণ্ঠস্বর কার্যত অনুপস্থিত।
এটি নিছক কূটনৈতিক সংযম নয়; এটি নীতিগত পশ্চাদপসরণ। আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি মূল নীতির উপর—কোনও রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের উপর একতরফা সামরিক আক্রমণ চালাতে পারে না। এই নীতিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ধারণা। অথচ পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাতে সেই নীতিই কার্যত অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ভারতের মতো একটি দেশ যদি এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় কিছু না বলে, তবে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
ভারতের এই নীরবতার পেছনে যে কৌশলগত হিসাব কাজ করছে, তা বোঝা কঠিন নয়। গত এক দশকে দিল্লির পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দিকে এগিয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল—সব মিলিয়ে ভারত এখন আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার। একই সময়ে ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও নজিরবিহীনভাবে গভীর হয়েছে। সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইজরায়েল ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতা দিল্লির কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোনও রাষ্ট্র কি তার নীতিগত অবস্থান সম্পূর্ণভাবে কৌশলগত সুবিধার কাছে সমর্পণ করতে পারে? ভারতের বর্তমান অবস্থান যেন সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিক অবস্থানকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক বলে ধরে নেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, এই ধরনের বাস্তববাদ দীর্ঘমেয়াদে প্রায়ই আত্মঘাতী হয়ে ওঠে।
পশ্চিম এশিয়া ভারতের জন্য কেবল দূরবর্তী কোনও ভূরাজনৈতিক অঞ্চল নয়। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং প্রবাসী ভারতীয়দের জীবনযাত্রা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উপসাগরীয় দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাছাড়া ভারতের তেল আমদানির বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে যদি ভারত এমনভাবে কূটনৈতিক অবস্থান নেয় যাতে তাকে একপাক্ষিক বলে মনে হয়, তবে তা ভবিষ্যতে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইরান নিজেও ভারতের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইরান একটি প্রধান প্রবেশদ্বার। চাবাহার বন্দরের মতো প্রকল্প সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপের কারণে ভারত সেই সম্পর্ক থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছে। বর্তমান সংকটে ভারতের নীরবতা সেই দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
এই অবস্থান ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ভারত নিজেকে প্রায়ই “গ্লোবাল সাউথ”-এর কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরতে চায়। আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশ ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে, যে শক্তিধর দেশগুলোর চাপের মুখেও স্বাধীন কণ্ঠ বজায় রাখতে পারে। কিন্তু যদি সেই ভারতই শক্তিশালী সামরিক জোটের আক্রমণের প্রশ্নে নীরব থাকে, তবে সেই নৈতিক নেতৃত্বের দাবি বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
আসলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। অজোট নিরপেক্ষতার যুগে ভারত যে কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিল, তার জায়গায় এখন এক ধরনের সতর্ক বাস্তববাদ জায়গা নিয়েছে। এই বাস্তববাদ কখনও কখনও প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু যখন তা নীতিগত অবস্থানকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলে, তখন তা কেবল কৌশলগত হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তা একটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়কেও বদলে দেয়।
আজকের ভারত নিজেকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু একটি শক্তির মর্যাদা শুধু অর্থনীতি বা সামরিক ক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না। আন্তর্জাতিক সংকটের মুহূর্তে সেই রাষ্ট্র কীভাবে কথা বলে, কী ধরনের নৈতিক অবস্থান নেয়—তার উপরও সেই মর্যাদা নির্ভর করে।
পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ সেই পরীক্ষার একটি মুহূর্ত। ভারতের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত সেই পরীক্ষায় খুব সন্তোষজনক নয়। বরং তা মনে করিয়ে দেয় যে কৌশলগত সুবিধার হিসাব কখনও কখনও একটি দেশের নীতিগত কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
ভারতের সামনে এখনও সুযোগ আছে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার। যুদ্ধ ও আগ্রাসনের প্রশ্নে একটি স্পষ্ট ও নীতিনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর তুলে ধরা শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়—এটি ভারতের নিজের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন। কারণ যে দেশ একসময় বিশ্বকে ন্যায় ও সহাবস্থানের কথা বলেছিল, তার কাছ থেকে এখনও বিশ্বের প্রত্যাশা কমে যায়নি।