Home দৃষ্টিভঙ্গিমগজাস্ত্রে শান অহং থেকে মুক্তির পথ

অহং থেকে মুক্তির পথ

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত এক ছোট্ট প্রবন্ধসংকলন Mein Weltbild (The World as I See It)-এ Albert Einstein এমন একটা কথা লিখেছিলেন, যার সঙ্গে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বা স্পেস-টাইমের কোনো সম্পর্কই নেই।

তিনি লিখেছিলেন,
“একজন মানুষের আসল মূল্য বোঝা যায় সে কতটা নিজের ‘self’ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে তার ওপর।”

যে মানুষটা আমাদের মহাবিশ্ব বোঝার ধরনটাই বদলে দিয়েছিলেন, তিনি আসলে ব্যক্তিগতভাবে ভাবছিলেন একেবারে অন্য জিনিস নিয়ে — কীভাবে নিজের অহং বা ‘আমি’ থেকে একটু দূরে থাকা যায়।

বহু বছর পরে আধ্যাত্মিক শিক্ষক Eckhart Tolle প্রায় একই জায়গায় এসে পৌঁছান। তবে তিনি সমীকরণ কষে নয়, গভীর মানসিক ভাঙনের ভেতর দিয়ে।

“Self” মানে আসলে কী?

আমরা যাকে “self” বলি, সেটা আসলে মাথার ভেতর চলতে থাকা একটানা গল্প।
“লোকজন কী ভাবছে?”,
“আমি যথেষ্ট ভালো তো?”,
“আমার ভবিষ্যৎ কী হবে?” —
এইসব চিন্তার গুঞ্জন।

এই যে মাথার ভেতরের কণ্ঠস্বর, যাকে আমরা রক্ষা করি, তুলনা করি, প্রমাণ করতে চাই — সেটাকেই আইনস্টাইন ‘self’ বলেছিলেন।

টোলেও একই জিনিস নিয়ে লিখেছেন তাঁর বই The Power of Now-এ। তীব্র বিষণ্ণতার সময় তিনি এক রাতে ভাবছিলেন, “আমি আর নিজের সঙ্গে থাকতে পারছি না।”

হঠাৎ তাঁর মাথায় প্রশ্ন এল —
যদি আমি নিজের সঙ্গে থাকতে না পারি, তাহলে “আমি” আর “নিজে” কি আলাদা দু’জন?

এই প্রশ্নটাই তাঁর জীবন পাল্টে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, একদিকে আছে সেই অস্থির, সমালোচক কণ্ঠস্বর। আর অন্যদিকে আছে সেই সচেতনতা, যে কণ্ঠস্বরটাকে লক্ষ্য করছে।

আইনস্টাইনও প্রায় একই কথা বলেছিলেন, শুধু ভাষা আলাদা ছিল। নিজের তৈরি মানসিক ‘আমি’ থেকে একটু দূরে দাঁড়াতে পারলেই মুক্তি।

বিজ্ঞান থেকে এই উপলব্ধি?

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল, আইনস্টাইন এই জায়গায় পৌঁছেছিলেন ধর্মীয় ধ্যান থেকে নয়, বিজ্ঞানের চর্চা করতে করতেই।

মহাবিশ্বের নিয়ম একেবারে নির্লিপ্ত।
গ্যালাক্সি তোমার আত্মসম্মান নিয়ে ভাবে না।
আলো তোমার অনুভূতির জন্য বাঁক নেয় না।
প্রকৃতির নিয়ম তোমার অহংকে গুরুত্ব দেয় না।

এই সত্য নিয়ে সারাজীবন ভাবতে ভাবতেই হয়তো মানুষ একটু বদলে যায়।

আইনস্টাইন খ্যাতি নিয়ে খুব ভাবতেন না। তিনি আসল আনন্দ পেতেন কাজে ডুবে থাকতে। যখন কোনো সমস্যার ভেতর পুরোপুরি ডুবে যেতেন, তখন ‘আমি’টা যেন হালকা হয়ে যেত। আজ আমরা যাকে “flow state” বলি — সেই অবস্থা।

যখন সময়ের হিসাব থাকে না, নিজের কথা মনে থাকে না — শুধু কাজটাই থাকে।

সেই মুহূর্তেই ‘self’ একটু সরে দাঁড়ায়।

শুধু দু’জন নন, অনেকেই একই কথা বলেছেন

রোমান সম্রাট ও দার্শনিক Marcus Aurelius তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি Meditations-এ নিজেকেই মনে করিয়ে দিতেন — বাইরের ঘটনা নয়, নিজের মনই আসল শক্তি।

ভিয়েতনামের জেন সন্ন্যাসী Thich Nhat Hanh বলেছিলেন, “সবচেয়ে মূল্যবান উপহার যা আমরা কাউকে দিতে পারি, তা হল আমাদের মনোযোগ।”
মনোযোগ দেওয়া যায় তখনই, যখন নিজের অহং একটু পাশে সরে দাঁড়ায়।

মনোসমীক্ষক Carl Jung লিখেছিলেন, “নিজেকে পুরোপুরি মেনে নেওয়াই সবচেয়ে ভয়ের।” কারণ আমরা যে মুখোশটা ধরে রাখি, সেটা সবসময় আসল ‘আমি’ নয়।

আলাদা সময়, আলাদা ভাষা — কিন্তু বার্তা একই।
অহংটাই জীবনের কেন্দ্র নয়।

তাহলে প্র্যাক্টিক্যালি কী করা যায়?

আমাদের কষ্টের বড় অংশ আসে মাথার ভেতরের সেই গল্প থেকে। আমরা সেই কণ্ঠস্বরকেই সত্যি ধরে নিই।

কিন্তু একটু থেমে যদি প্রশ্ন করি —

কে রেগে আছে?
কোন পরিচয়টা আঘাত পেয়েছে?
কে এই সবকিছু লক্ষ্য করছে?

এই প্রশ্নগুলো সমস্যাকে সঙ্গে সঙ্গে মুছে দেয় না। কিন্তু একটা দূরত্ব তৈরি করে।

আইনস্টাইন বলছেন, জীবনের মানে সুখ, সাফল্য বা নাম রেখে যাওয়া নয়। জীবনের মানে হল — তুমি কতটা নিজের গুরুত্ববোধ থেকে মুক্ত হতে পেরেছ।

শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু যাদের আমরা সত্যি শান্ত মানুষ বলি, তারা সাধারণত নিজেদের নিয়েই মগ্ন থাকে না। তারা কৌতূহলী হয় অন্য মানুষ, কাজ, বা পৃথিবী নিয়ে।

ছোট ছোট মুহূর্তেই মুক্তি

টোলের ভাষায়, মাথার ভেতরের কণ্ঠস্বরটাই তুমি নও। তুমি সেই ব্যক্তি, যে কণ্ঠস্বরটাকে শুনতে পাচ্ছে।

এই “কণ্ঠ” আর “দেখছে যে” — এই দু’য়ের মাঝখানের ফাঁকটাই আসল জায়গা।

আইনস্টাইন যাকে বলেছিলেন “liberation from the self” — নিজের তৈরি অহং থেকে একটু মুক্তি।

মহাবিশ্ব তোমাকে কেন্দ্র করে ঘোরে না।
এই সত্য প্রথমে ছোট করে দেয়।
কিন্তু পরে আশ্চর্যভাবে হালকা করে দেয়।

একজন পদার্থবিজ্ঞানী অফিসে বসে এই কথা বুঝেছিলেন।
একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষক লন্ডনের এক ফ্ল্যাটের মেঝেতে বসে বুঝেছিলেন।

তুমিও হয়তো বুঝতে পারবে —
যখন একটু চুপ করে নিজের মাথার ভেতরের গল্পটা শুধু লক্ষ্য করবে।

হয়তো জীবনটা তখন এত ভারী লাগবে না।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles