সোমক রায়চৌধুরী: হ্যারি ব্রুকের এই ইংল্যান্ড ক্রিকেট মানচিত্র থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ওয়েস্টইন্ডিজ নয়। সূর্যকুমার যাদবরা তা বিলক্ষণ জানেন। কোর্টনি ওয়ালশ এখন জিম্বাবোয়ের বোলিং কোচ, ইয়ান বিশপ এই বিশ্বকাপে এসেছেন ধারাভাষ্যকার হিসেবে। তাই রবিবাসরীয় ইডেনে সঞ্জু স্যামসন-তিলক বর্মাদের ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য এরা তো ছাড়, একটা উইনস্টন বেঞ্জামিনও ছিল না শেই হোপের ক্যারিবিয়ান দলে। এই ‘”হোপলেস” বোলিং-এর বিরুদ্ধে ম্যাচ বের করে নিতে বিশেষ বেগ পেতে হয় নি তারা-খচিত ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে। বৃহস্পতিবার ওয়াংখেড়েতে ইংলিশ বোলিং-এর বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে খেলাটা কিন্তু তত সহজ হবে না! বিষয়টা হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন গৌতম গাম্ভীর-সূর্যকুমার যাদবরা। আর তাই, মঙ্গলবার মূল নেটে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস এর তিন তারা ব্যাটার-সূর্যকুমার, তিলক ভর্মা ও হার্দিক পান্ডিয়া, দু’ঘন্টার ওপর ব্যাটিং অনুশীলন করে নিলেন। মহারণের আগে বিশেষ প্রস্তুতি। একটা তথ্য কিঞ্চিত স্বস্তি দিতে পারে ভারতীয় শিবিরকে, যে ওয়াংখেড়ের যে উইকেট সেমিফাইনালের জন্য নির্ধারিত, সেখানেই গ্রুপ পর্বে ওয়েস্টইন্ডিজের কাছে হেরেছিল ইংল্যান্ড। অবশ্য ওই হারের পর সুপার এইটে টানা তিন ম্যাচই জিতেছে তারা।
হয়ত আহমেদাবাদে দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ব্যাটিং ভরাডুবিও কিছুটা ভাবাতে পারে টিম ইন্ডিয়াকে। হ্যারি ব্রুকদের বোলিং-আক্রমণ দক্ষিণ আফ্রিকার পেস-নির্ভর বোলিং এর থেকেও বৈচিত্রপূর্ণ। বিশেষ করে উপমহাদেশীয় উইকেটে, যেখানে পেসারদের থেকে মন্থরগতির বোলাররা ম্যাচের রঙ বদলাতে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে থাকেন। হ্যারি ব্রুকের হাতে যেমন গতির তাস আছে, তেমন রয়েছে ফর্মে থাকা আদিল রশিদ-লিয়াম ডসন-উইল জ্যাকসের ত্রিভুজ ঘূর্ণির তাসও। এই ত্রিকোণ স্পিন আক্রমণের জন্যই দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখছেন প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। “বরুণ চক্রবর্তী-আক্সার প্যাটেলদের মতো ভারতীয় স্পিনাররা বড্ড বেশি রান দিয়ে ফেলছেন। ঠিক এখানেই ইংল্যান্ডের স্পিনাররা এগিয়ে। তিনজনই উইকেটের মধ্যে রয়েছে, এবং যে কোনও ম্যাচে ফ্যাক্টর হয়ে যেতে পারে। ভারত যদি কুলদীপ যাদবকে খেলায় অবাক হব না”। ভনের বিশ্লেষণ। তবে কুলদীপের কথা ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের মাথায় থাকলেও, তিনি যে ওয়াংখেড়েতে খেলবেনই, এমন কথা জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। কারণ উইনিং কম্বিনেশন ভেঙে শিবম দুবে বা আক্সার প্যাটেলকে সহজে বসাতে চাইবেন না সূর্যকুমাররা। যদিও ষষ্ঠ বোলার হিসেবে শিবমকে ব্যবহার করা বেশ ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। আবার এটাও শোনা যাচ্ছে যে, রিঙ্কু সিংকে নিয়েও একটা পরিকল্পনা রয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের।
“ক্যাচেস উইন ম্যাচেস”
আর একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে সতর্ক থাকতে হবে টিম ইন্ডিয়াকে। এই টুর্নামেন্টে ফিল্ডিং ব্যর্থতা, বিশেষ করে আউট-ফিল্ডে ক্যাচ ফেলা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে গাম্ভীরের দলে কাছে। রবিবারের সান্ধ্য ইডেনেও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময় পড়েছে ক্যাচ। সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপে মোট তেরোটা ক্যাচ ফেলেছেন ভারতীয় ফিল্ডাররা। তা সত্ত্বেও সেমিফাইনাল অবধি উঠে আসতে পেরেছেন তিলক-ইশানরা; কিছুটা বুমরা-হার্দিকদের টিমের ভারে, কিছুটা বিপক্ষ দলগুলোর দুর্বলতার জন্য। কিন্তু বৃহস্পতিবারও যদি এই ক্যাচ ফেলার বহর বজায় থাকে, তাহলে আর এগোনো যাবে তো?

একটু স্মৃতি হাঁতড়ে দেখুন সূর্যকুমাররা, আহমেদাবাদে একদিনের বিশ্বকাপের ফাইনালে ট্রাভিস হেডের সেই দুরন্ত ক্যাচ, যা ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মাকে প্যাভিলিওনে ফিরিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল; তাতিয়ে দিয়েছিল পুরো অস্ট্রেলিয়া টিমকে। বা ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ ওভারের প্রথম বলে বাউন্ডারির বাইরে চলে গিয়েও সূর্যকুমারের নেওয়া সেই অবিশ্বাস্য ক্যাচ। দুটো ক্যাচই ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা নিয়েছিল। তাই হ্যারি ব্রুকদের বিরুদ্ধে ফিল্ডিং সেট করা থেকে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ সুযোগগুলো তালুবন্দি করা, দুই বিষয়ই বাড়তি সতর্ক থাকতেই হবে অধিনায়ক সহ পুরো ভারতীয় দলকে। মাথায় রাখুন, এই ইংল্যান্ড টিমের ফিল্ডিং কিন্তু ঈর্ষণীয়, যা এই সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেটে যে কোনও মুহূর্তে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্টে পর্যবসিত হতে পারে!
“বুমস বনাম ব্রুক “
টিম ইন্ডিয়ার জন্য সামান্য স্বস্তির, হোয়াইট বল ক্রিকেটের বিস্ফোরক ব্যাটার জস বাটলার বিশ্বকাপে একেবারেই ছন্দে নেই। সুবিধে করতে পারছেন না তার ওপেনিং জুটি ফিল সল্টও। ওপেনারদের এই ব্যর্থতা সামলে দিচ্ছেন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের দুরন্ত ফর্ম। পাকিস্তানে সদ্য ট্রিপল সেঞ্চুরি করে আসা ব্রুক সুপার এইটের ম্যাচেও পাক বোলারদের তুলোধোনা করে ৫১ বলে শতরান করেন; ব্রুকের উইকেট নিতে সূর্যকুমারের ভরসা সেই যশপ্রীত বুমরা। বুমরার চার ওভার কোন কোন পরিস্থিতিতে, কখন ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভারতের কাছে।

বলা যায়, উইকেট নেওয়া থেকে ইংল্যান্ডের রানের গতি আটকানো, ভারতীয় বোলিং ভীষণভাবে নির্ভরশীল অভিজ্ঞ বুমস এর ওপর। ওয়াংখেড়ের ছোট বাউন্ডারিতে বল করার সময় আক্সার-বরুণদের ভুলের শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। ব্রুক, পোড়খাওয়া লেগ স্পিনার আদিল রাশিদ, অভিষেক শর্মা, ইশান কিষাণ, তিলকদের মতো বাঁ হাতিদের বিপদে ফেলতে সক্ষম অফ স্পিনার জ্যাকস ছাড়াও আরও একটি তুরুপের তাস রয়েছে ব্রেন্ডন ম্যাককুলামের প্রশিক্ষণাধীন দলে -অলরাউন্ডার স্যাম কারেন।
প্রয়াত জিম্বাবোয়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার কেভিন কারেন আশির দশকে বিশ্বকাপ খেলে গিয়েছিলেন ভারতের মাটিতে; ইডেন-ওয়াংখেড়েতেও খেলেছিলেন এই অলরাউন্ডার। বর্তমান ইংল্যান্ড টিম ও রাজস্থান রয়েলসের ক্রিকেটার তার ছেলে স্যামও অলরাউন্ডার। এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জয় বলে-ব্যাটে নিয়মিত ভূমিকা নিচ্ছেন স্যাম। ভারতের জয় দেখতে হাউসফুল ওয়াংখেড়ে-গ্যালারি যে গর্জন করবে তা জানে গোটা ইংল্যান্ড দল। তাই সেমিফাইনালে মাঠে নামার আগে স্যামের প্রতিক্রিয়া, “এই ম্যাচটা পেতে, আমরা আমাদের নিখুঁত খেলাটা বের করে আনার জন্য সর্বস্ব পণ করব, কারণ এটা বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল”। টপ অর্ডারে কম্বিনেশন বদলাতে সঞ্জু স্যামসনকে দলে ফিরিয়ে রবিবার বাজিমাত করেছিল ভারত। আইপিএলে পোড়খাওয়া ৩১-বছর বয়সী সঞ্জুর ইডেনে করা অপরাজিত ৯৭’এ টিমকে সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ছন্দে থাকা উইকেট কিপার-ব্যাটারকে ঝামেলায় ফেলতে জোফ্রা আর্চারকে দিয়ে শর্ট বল করিয়ে আক্রমণ হানবেন ম্যাককুলাম-ব্রুকরা। ইংল্যান্ড কোচ জানেন সঞ্জুর টেকনিকে দুর্বলতা কোথায়। এই কৌশলে আর্চারের সঙ্গী হবেন স্যাম কারেন! ওয়েস্টইন্ডিজ ম্যাচের সাফল্য ধরে রাখতে গেলে সঞ্জু স্যামসনকে এর উত্তর বের করতে হবে। ইশান কিষাণ, অভিষেক শর্মা, তিলক ভর্মাদের বড় ম্যাচের টেম্পরামেন্ট দেখাতে হবে। নিজেদের ইনিংস বা ইংল্যান্ডের ইনিংস– দুই পর্বেই শেষ পাঁচ ওভার নার্ভ ধরে রাখতে হবে টিম ইন্ডিয়াকে, কারণ এই সময়ে নির্ধারিত হতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
“বাজ-ফ্যাক্টর”
এবং কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম। টি-২০ ক্রিকেটের ইতিহাসে, ইডেনে আইপিএল উদ্বোধনী ম্যাচে ম্যাককুলামের ইনিংসটা রূপকথা হয়ে রয়ে গিয়েছে। এই ফরম্যাটের ক্রিকেটে তার উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় বারবার পেয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব। ইংল্যান্ডের হেডকোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর, যে আগ্রাসী “বাজবল” ক্রিকেটের প্রচলন হয়েছে,তা সম্পূর্ণ তারই মস্তিষ্ক-প্রসূত। “বাজ” ডাকনামে পরিচিত প্রাক্তন উইকেটকিপার-ব্যাটারের দর্শন হল– ক্রিকেট আরও বেশি বিনোদন দিক দর্শকদের। তাই একের পর এক নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে চলেছেন ম্যাককুলাম। এই জায়গায় ভারতের হেডকোচ গৌতম গাম্ভীরের থেকে অন্তত একশো মাইল এগিয়ে বাজ। গাম্ভীরের দল নির্বাচন নিয়েই বারবার উঠছে বিতর্ক!

এই নিয়ে পরপর তৃতীয় বার টি-২০ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ভারত-ইংল্যান্ড। অতীতে দুবারই যারা এই ম্যাচ জিতেছে, তাদের হাতেই উঠেছে কাপ। ২০২২’এ ইংল্যান্ড, শেষবার ২৪’এ ভারত। এ যাবত কুড়ি-২০ বিশ্বকাপে মোট পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই দেশ। ফলাফল ভারতের পক্ষে ৩-২। বৃহস্পতিবার মুম্বাই’এর দর্শকরা স্টেডিয়াম ভরিয়ে দেবেন প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে। ভারতের জয়ের সম্ভাবনা যেমন প্রলম্বিত করবে হোলির রাঙ্গোলি, তেমনই হারের গ্রাসে পড়লে রাতারাতি গ্যালারি থেকে মুছে যাবে সব রং।
ব্রেন্ডন “বাজ” ম্যাককুলাম পরিকল্পনা তৈরি করছেন দ্বিতীয়টা তরাণ্বিত করার।
ইংল্যান্ড এই প্রতিযোগিতায় অনেকগুলো হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ জিতেছে। শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে রান তাড়া করতে গিয়ে শেষ ১৬ বলে ৪৪ রান করে জিতিয়েছিলেন উইল জ্যাকস- রেহান আহমেদ জুটি। বারবার এই ক্লোজ ম্যাচ বের করতে পারার ক্ষমতাকে দারুণ ইতিবাচক ভাবে দেখছেন ব্রুক। “আমাদের দলগত সংহতি এমনই যে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস আছে। চাপের মুখে তাই ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ বের করছে ছেলেরা। জেতার ফর্মুলা হল, প্রথম সাতের একজনের বড় রান পাওয়া, আর বোলারদের মধ্যে একজনের ম্যাচে অসামান্য হয়ে ওঠা”। ব্রুকের কথাতে পরিস্কার, ভারতের বিরুদ্ধেও “ঠান্ডা মাথায়” ম্যাচ বের করার গেমপ্ল্যান করেছে ইংল্যান্ড শিবির।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ড-ম্যাচের আগে গাম্ভীরের টিম যে প্রবল চাপে রয়েছে, তা বোঝা গেল দলে কুসংস্কারের প্রভাব পড়তে দেখে। মঙ্গলবার টিম ইন্ডিয়ার নেট প্র্যাকটিস শুরু হল অনেক দেরি করে, যাতে অনুশীলনে চন্দ্রগ্রহনের কোনও নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে!
এবং ওয়াংখেড়ের উইকেট। যা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এখনও পর্যন্ত উইকেটে একটা হালকা ঘাসের আবরণ রাখা হয়েছে, যাতে ম্যাচ চলাকালীন পিচে ফাটল না ধরে। ইংল্যান্ডের স্পিন-ত্রয়ী যাতে যাতে বাড়তি ফায়দা না তুলতে, পারেন তাই এই কৌশল। সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে অধিনায়ক সহ বাকি ভারতীয় ব্যাটারদের। এখনও পর্যন্ত, এই বিশ্বকাপের যা ট্রেন্ড, তাতে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজন-দুজনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের জোরে ম্যাচ বের করছে যে কোনও টিম। ভারতীয় বোলিং কোচ মর্নে মর্কেল তাই বললেন, “নিখুঁত ক্রিকেট খেলা নিয়ে ভাবছি না। এখানে ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন-দুজন ক্রিকেটারের জ্বলে ওঠাটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ”। সূর্যকুমার, হার্দিক পান্ডিয়া, বুমরারা এই মন্ত্র নিয়েই মাঠে নামবেন। হোলির সন্ধ্যায় ইডেনে যেমন ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করে বিশ্বকাপের সেরা দলকে পত্রপাঠ বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন নিউজিল্যান্ডের তরুণ অ্যালেন ফিন। এই পর্যায়ে ম্যাচ বের করতে গেলে কিন্তু ফিনের মতোই কিছু করে দেখাতে হবে সূর্যদের!